ব্যবসার শেয়ার নাকি জীবন? সোহেলের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে স্তব্ধ দেশ
রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে দিনের আলোতে যা ঘটলো, তা কোনো সিনেমার দৃশ্য নয়, এক নির্মম বাস্তবতা। কংক্রিট বোল্ডার দিয়ে থেঁতলে সোহেল নামের একজন ব্যবসায়ীকে হত্যা করার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর আজ পুরো দেশ শোকাহত এবং ক্ষুব্ধ। কিন্তু কেন এই নৃশংসতা? এর পেছনে লুকিয়ে আছে চাঁদা আর ক্ষমতার এক ভয়াল গল্প।
পরিবারের শূন্যতা: “বাবাকে যারা মেরেছে, তাদের বিচার চাই”
শনিবার সকালে বরগুনার গ্রামের বাড়িতে সোহেলের স্ত্রী লাকি বেগমের কান্নাজড়িত কণ্ঠ বাতাসকে ভারী করে তুলছিল। দুই সন্তানকে বুকে জড়িয়ে তিনি বলছিলেন, “আমার স্বামীর ব্যবসা ওদের সহ্য হচ্ছিল না। প্রতি মাসে দুই লাখ টাকা চাঁদা চাইছিল। আমার স্বামী দেয়নি, আর এ কারণেই তাকে এভাবে মরতে হলো।”
সোহেলের ১২ বছরের ছেলে সোহান আর ১৪ বছরের মেয়ে সোহানার চোখের জল শুকিয়ে গেছে। বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে সোহান বলে, “চাঁদা না দেওয়ায় ওরা বাবাকে মেরে ফেলেছে। আমরা তো এতিম হয়ে গেলাম। যারা আমার বাবাকে মেরেছে, আমি তাদের বিচার চাই।” এই দুটি নিষ্পাপ শিশুর ভবিষ্যতের কথা ভেবে আজ এলাকাবাসীও নির্বাক।
দ্বন্দ্বের সূত্রপাত: সততার ‘শাস্তি’
সোহেল একসময় সাধারণ চাকরি করতেন। কঠোর পরিশ্রমে ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছিলেন নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স সোহানা মেটাল’। তার এই সাফল্যই হয়তো কারো কারো চোখের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। স্থানীয় প্রভাবশালীরা তার ব্যবসার শেয়ার দাবি করে, নয়তো প্রতি মাসে দুই লাখ টাকা চাঁদা চায়।
সৎ পথে রোজগার করা সোহেল এই অন্যায় আবদারের কাছে মাথা নত করতে রাজি হননি। আর তখন থেকেই শুরু হয় দ্বন্দ্ব। তার দোকানে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়, নানাভাবে হুমকি দেওয়া হয়। কিন্তু সোহেল তার অবস্থানে দৃঢ় ছিলেন।
সেই ভয়াল বুধবার: সমাধানের নামে ডেকে নিয়ে হত্যা
বুধবার বিকেলে সোহেলকে “সমস্যার সমাধান” করার কথা বলে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু আলোচনার আড়ালে ছিল এক ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা। চাঁদার দাবিতে তাকে আটকে রেখে চাপ দেওয়া হয়। কিন্তু সোহেল ছিলেন নির্ভীক। অন্যায়ের কাছে মাথানত করতে অস্বীকৃতি জানালে মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটের সামনে প্রকাশ্যে তার ওপর চালানো হয় নারকীয় নির্যাতন। কংক্রিটের ভারী বোল্ডার দিয়ে তার মাথা ও শরীর থেঁতলে দেওয়া হয়, নিশ্চিত করা হয় মৃত্যু।
দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ও বিচার দাবি
এই পাশবিক হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সকলেই এই ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানায়। সোহেলের ভাগ্নি বিথী কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “আমরা বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের মতো এই মামলারও দ্রুত বিচার চাই। ওদের প্রকাশ্যে গুলি করে মারা হোক।”
এই দাবি আজ শুধু সোহেলের পরিবারের নয়, দেশের সকল শান্তিকামী মানুষের।
আইনের পদক্ষেপ: পাঁচজন গ্রেপ্তার
এই ঘটনায় দেশব্যাপী সমালোচনার মুখে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। সোহেলের বড় বোন মঞ্জুরা বেগম ১৯ জনের নামে মামলা করার পর পুলিশ ও র্যাব অভিযান চালিয়ে এখন পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানিয়েছেন লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাও এই ঘটনাকে ‘দুঃখজনক’ বলে আখ্যা দিয়ে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দিয়েছেন।
সোহেলের এই আত্মত্যাগ এক কঠিন প্রশ্ন রেখে গেল। সততার সাথে ব্যবসা করা কি আজ অপরাধ? দিনের আলোতে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড কি আমাদের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না? সোহেলের পরিবার আজ বিচার চায়, আর পুরো দেশ তাকিয়ে আছে আইনের শাসনের দিকে। এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে হয়তো এমন আরও অনেক সোহেলকে অন্যায়ের বলি হতে হবে।
