Falcon Feed

পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্ত্রীকে জীবন্ত পুঁতে ফেলার চেষ্টা এবং আমাদের সমাজের প্রতিবিম্ব

পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্ত্রীকে জীবন্ত পুঁতে ফেলার চেষ্টা এবং আমাদের সমাজের প্রতিবিম্ব

শেরপুর, বাংলাদেশ – সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও সম্প্রতি বাংলাদেশের মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলায় আশীতিপর এক বৃদ্ধ তার পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্ত্রীকে জীবন্ত পুঁতে ফেলার চেষ্টা করছেন—এই মর্মান্তিক দৃশ্য আমাদের সমাজের এক কঠিন এবং অন্ধকার বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। ঘটনাটি শুধু এক ব্যক্তির হতাশার বহিঃপ্রকাশ নয়, এটি আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিকতার এক বড় পরীক্ষা।

গত শুক্রবার, ৮ আগস্ট, ২০২৫, উপজেলার কাকিলাকুড়া ইউনিয়নের খোশালপুর কানিপাড়া এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। অভিযুক্ত স্বামী মো. খলিলুর রহমান (৮০) তার ৭০ বছর বয়সী স্ত্রী খোশেদা বেগমকে, যিনি গত ছয় বছর ধরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত এবং শয্যাশায়ী, ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে বাড়ির উঠোনে নিয়ে আসেন। উঠোনের এক কোণে আগে থেকেই একটি ছোট গর্ত খুঁড়ে রেখেছিলেন তিনি।

ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, খলিলুর রহমান তার অসুস্থ স্ত্রীকে সেই গর্তে ফেলে কোদাল দিয়ে মাটি চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। খোশেদা বেগমের প্রাণপণ আর্তনাদ আর বাঁচার আকুতি পাষাণ হৃদয়েও কাঁপন ধরিয়ে দেয়। আরও দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, এসময় আশেপাশে কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে থাকলেও কেউ তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি। এক পর্যায়ে খলিলুর রহমান নিজেই ক্লান্ত হয়ে স্ত্রীকে ওই অবস্থায় ফেলে চলে যান।

কেন এই নির্মমতা?

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এই ঘটনার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের ক্লান্তি, হতাশা এবং দারিদ্র্য। জানা যায়, গত ছয় বছর ধরে স্ত্রী খোশেদা বেগমের সেবাযত্ন করে আসছিলেন খলিলুর রহমান। চিকিৎসার পেছনে অর্থ ব্যয় করেও কোনো উন্নতি হয়নি। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত এই বৃদ্ধ দম্পতির জীবন সংগ্রাম অবশেষে খলিলুর রহমানকে এই ভয়ঙ্কর পথে ঠেলে দেয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রতিবেশী সুজন মিয়ার মতে, ঘটনার দিন সকালেও খলিলুর রহমান তার স্ত্রীর জন্য একটি নতুন চেয়ার ও কমোড কিনে এনেছিলেন। কিন্তু সম্ভবত স্ত্রীর কথা শুনতে না পাওয়া বা অন্য কোনো ছোট বিষয়ে বিরক্ত হয়ে তিনি মেজাজ হারিয়ে ফেলেন এবং এই মর্মান্তিক কাণ্ড ঘটান। পরিবারের এক নাতির ধারণ করা ভিডিওটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি সবার নজরে আসে।

প্রশাসনের ভূমিকা এবং সামাজিক সমাধান

শ্রীবরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আনোয়ার জাহিদ জানিয়েছেন যে, ভিডিওটি দেখার পরপরই ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। তবে তিনি আরও বলেন, “বিষয়টি স্থানীয়ভাবে সমাধান হয়েছে বলে শুনেছি। তবে লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এই “স্থানীয় সমাধান” আসলে কী, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। একজন মৃত্যুপথযাত্রী নারীকে এভাবে হত্যার চেষ্টার ঘটনা কি কেবল স্থানীয়ভাবে সমাধানযোগ্য? এই সমাধান কি খোশেদা বেগমের নিরাপত্তা এবং সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করতে পারবে?

সমাজের প্রতিচ্ছবি

এই ঘটনাটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সামনে নিয়ে আসে:

  • দীর্ঘমেয়াদী রোগীর পরিচর্যার সংকট: বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত, বিশেষ করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত বা স্মৃতিভ্রষ্ট রোগীদের পরিচর্যার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বা সামাজিক সহায়তার ব্যাপক অভাব রয়েছে। পরিবারের সদস্যরা, বিশেষ করে যদি তারা বয়স্ক এবং আর্থিকভাবে অসচ্ছল হন, তবে তাদের উপর প্রচণ্ড মানসিক এবং শারীরিক চাপ সৃষ্টি হয়।
  • দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর রূপ: দারিদ্র্য কীভাবে মানুষকে মানবিকতার শেষ সীমা থেকেও ঠেলে নিচে নামাতে পারে, এই ঘটনা তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। চিকিৎসা ও ওষুধের খরচ জোগাতে ব্যর্থ হয়ে খলিলুর রহমানের এই চরম পদক্ষেপ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
  • সামাজিক উদাসীনতা: ভিডিওতে উপস্থিত জনতার নীরবতা আমাদের সমাজের এক বড় অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরে। अन्याय দেখেও প্রতিবাদ না করার এই সংস্কৃতি দিন দিন আমাদের আরও বিচ্ছিন্ন ও আত্মকেন্দ্রিক করে তুলছে।

খোশেদা বেগমের আর্তনাদ শুধু তার একার নয়, এটি আমাদের সমাজে অযত্ন, অবহেলা এবং দারিদ্র্যের শিকার হওয়া অসংখ্য মানুষের আর্তনাদের প্রতিধ্বনি। এই ঘটনা আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। কেবল আইনি ব্যবস্থা গ্রহণই যথেষ্ট নয়; আমাদের এমন একটি সমাজ গঠন করতে হবে যেখানে খলিলুর রহমানের মতো পরিচর্যাকারীরা একা এবং অসহায় বোধ করবেন না এবং খোশেদা বেগমের মতো রোগীদের জীবনের শেষ দিনগুলো মর্যাদা ও সুরক্ষার সাথে কাটবে।

Source: Prothomalo

Related Articles