Falcon Feed

ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি সত্ত্বেও রাশিয়াতেই আস্থা মোদীর! কেন ভারত তেল কেনা বন্ধ করবে না?

ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি সত্ত্বেও রাশিয়াতেই আস্থা মোদীর! কেন ভারত তেল কেনা বন্ধ করবে না?

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আমেরিকা এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা রাশিয়ার উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। লক্ষ্য ছিল রাশিয়ার অর্থনীতিকে দুর্বল করে যুদ্ধ থামানো। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে ভারত এক ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। পশ্চিমা চাপ এবং শুল্ক আরোপের হুমকি সত্ত্বেও, ভারত শুধু রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা বন্ধই করেনি, বরং আমদানি আরও বাড়িয়েছে। কিন্তু কেন ভারত আমেরিকার মতো শক্তিশালী মিত্রের অসন্তোষের ঝুঁকি নিয়েও রাশিয়ার পাশে দাঁড়িয়েছে? এর পেছনে রয়েছে গভীর অর্থনৈতিক এবং ভূ-রাজনৈতিক কৌশল।

অর্থনৈতিক লাভ: ছাড়ের তেলের হাতছানি

ভারতের এই সিদ্ধান্তের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হল অর্থনৈতিক সুবিধা। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা দেশগুলো যখন রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করে দেয়, তখন রাশিয়া আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অনেক কম দামে তেল বিক্রি করতে বাধ্য হয়। ভারত এই সুযোগটি পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে।

  • বিশাল ছাড়: রাশিয়া ভারতকে ব্যারেল প্রতি আকর্ষণীয় ছাড় দিয়েছে, যা ভারতের জন্য তেল আমদানিকে অত্যন্ত লাভজনক করে তুলেছে।
  • আমদানি বৃদ্ধি: এই ছাড়ের ফলে, যুদ্ধের আগে ভারতের মোট তেল আমদানিতে রাশিয়ার অংশ ছিল মাত্র ১%, যা যুদ্ধের পর বেড়ে ৩৫% এর বেশিতে পৌঁছেছে।

আমেরিকার দাবি, এই তেল বিক্রির অর্থ রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহার করছে, এবং ভারত পরোক্ষভাবে রাশিয়াকে সাহায্য করছে। এই কারণে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ভারতীয় পণ্যের উপর বাড়তি শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিল। কিন্তু ভারতের কাছে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সবার আগে।


জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা

ভারত বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ। এর বিশাল জনসংখ্যার জন্য প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানির প্রয়োজন হয়।

  • চাহিদা ও জোগানের ফারাক: ভারত তার প্রয়োজনীয় তেলের সিংহভাগই আমদানি করে, কারণ দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন চাহিদার তুলনায় নগণ্য।
  • বিকল্পের অভাব: এই বিশাল চাহিদা মেটাতে ভারতের সস্তা এবং নির্ভরযোগ্য জ্বালানির উৎস প্রয়োজন। রাশিয়া সেই প্রয়োজনটি পূরণ করছে।

সস্তায় তেল পাওয়ার সুযোগ ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এক বিরাট স্বস্তির কারণ, যা দেশের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করে।


শুধু কেনা নয়, পরিশোধন করে লাভবানও হচ্ছে ভারত

বিষয়টি শুধু সস্তায় অপরিশোধিত তেল কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভারত এই তেল আমদানি করে একটি লাভজনক ব্যবসায়িক মডেলেও পরিণত করেছে।

ভারত রাশিয়া থেকে সস্তায় অপরিশোধিত তেল কিনে নিজেদের রিফাইনারি বা শোধনাগারে তা পরিশোধন করে। এরপর সেই পরিশোধিত পেট্রোল, ডিজেল এবং অন্যান্য জ্বালানি ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে। মজার বিষয় হল, ইউরোপের অনেক দেশ রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও, भारत থেকে পরিশোধিত তেল কিনতে তাদের কোনো আপত্তি নেই। এর ফলে, রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের মতো বড় ভারতীয় সংস্থাগুলো প্রচুর লাভবান হচ্ছে, যার ইতিবাচক প্রভাব শেয়ার বাজারেও দেখা গেছে।


বদলে যাওয়া ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ

এই তেল কূটনীতির পেছনে একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও রয়েছে।

  • চীনের বিরুদ্ধে ভারসাম্য: আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব কমাতে ভারতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হিসেবে দেখে আসছে।
  • ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন: কিন্তু রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের এই ঘনিষ্ঠতা আমেরিকার পরিকল্পনায় একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ভারত স্পষ্ট বার্তা দিতে চায় যে, তারা কোনো একটি নির্দিষ্ট ব্লকের উপর নির্ভরশীল নয় এবং নিজেদের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে।
  • আমেরিকার অস্বস্তি: একদিকে চীন, অন্যদিকে ভারত—উভয়েই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাশিয়া থেকে তেল কেনা চালিয়ে যাওয়ায় আমেরিকা ভূ-রাজনৈতিকভাবে বেশ অস্বস্তিতে পড়েছে। অনেকের মতে, ভারতের উপর শুল্ক আরোপের হুমকি এই হতাশারই প্রতিফলন।

সব মিলিয়ে, ভারতের রাশিয়া থেকে তেল কেনার সিদ্ধান্তটি কোনো আকস্মিক পদক্ষেপ নয়। এটি অর্থনৈতিক লাভ, জ্বালানি নিরাপত্তা, এবং একটি স্বাধীন বৈদেশিক নীতির এক বিচক্ষণ সংমিশ্রণ, যা প্রমাণ করে যে নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় ভারত তার নিজের শর্তে এগিয়ে যেতে প্রস্তুত।

Related Articles