আজ থেকে ২৪ বছর আগে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। আমেরিকার আর পাঁচটা দিনের মতোই শুরু হয়েছিল সকালটা। নিউইয়র্কের ব্যস্ত রাস্তায় অফিসগামী মানুষের ভিড়, আকাশে উড়ছিল বাণিজ্যিক বিমান, আর ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারের মাথায় ঝলমল করছিল সকালের রোদ। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই রোদ ঢেকে গেল ধোঁয়া, ছাই আর আর্তনাদের অন্ধকারে। আল-কায়েদার ১৯ জন সন্ত্রাসী চারটি বিমান ছিনতাই করে একযোগে হামলা চালায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে, যা পাল্টে দেয় গোটা বিশ্বের ইতিহাস। এই দিনটি ‘নাইন-ইলেভেন’ নামে পরিচিত, যা আজও মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে স্মরণ করা হয়।
সেই ভয়াল সকাল: যা ঘটেছিল
- সকাল ৮:৪৬: আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১১ তীব্র গতিতে আঘাত হানে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নর্থ টাওয়ারে। প্রথমে অনেকেই এটিকে একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা বলে মনে করেছিলেন। শহরজুড়ে তৈরি হয় তীব্র আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি।
- সকাল ৯:০৩: সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১৭৫ সরাসরি আঘাত করে সাউথ টাওয়ারে। এবার আর কারও বুঝতে বাকি থাকে না যে আমেরিকা এক সুপরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলার শিকার। আকাশ কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যায়, আর দুটি টাওয়ার থেকেই আগুনের লেলিহান শিখা বের হতে থাকে।
- সকাল ৯:৩৭: তৃতীয় বিমান, আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৭৭, আছড়ে পড়ে ভার্জিনিয়ায় মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের উপর।
- সকাল ৯:৫৯: আঘাতে দুর্বল হয়ে পড়া সাউথ টাওয়ারটি বিশাল ধুলার ঝড় তুলে মাটিতে ধসে পড়ে।
- সকাল ১০:০৩: চতুর্থ ছিনতাই হওয়া বিমান, ফ্লাইট ৯৩, পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়। জানা যায়, যাত্রীরা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালে তাদের লক্ষ্য (সম্ভবত হোয়াইট হাউস বা ক্যাপিটল বিল্ডিং) ব্যর্থ হয়।
- সকাল ১০:২৮: অবশেষে নর্থ টাওয়ারও ধসে পড়ে, যা গ্রাউন্ড জিরোকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে।
এক বছরের প্রশিক্ষণ: হামলার পেছনের গল্প
এই ভয়াবহ হামলা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এর পেছনে ছিল আল-কায়েদার দীর্ঘ এক বছরের সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি। হামলাকারীরা அமெரிக்காவில் সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে গিয়েছিল। তাদের কেউ কেউ মার্কিন নাগরিক বা গ্রিন কার্ডধারী হওয়ায় সহজেই তারা বিভিন্ন ফ্লাইট স্কুলে বিমান চালনার প্রশিক্ষণ নেয়।
তাদের উদ্দেশ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং ইসরায়েলের প্রতি সমর্থনের প্রতিশোধ নেওয়া। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো, তারা এতটাই গোপনে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছিল যে তাদের আশপাশের কেউই, এমনকি ফ্লাইট স্কুলের প্রশিক্ষকরাও, সামান্যতম সন্দেহ করেননি। তারা সাধারণ জীবনযাপন করত, বিভিন্ন ব্যবসায় কাজ করত এবং সমাজের অংশ হয়ে উঠেছিল শুধুমাত্র তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য।
নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা ও ফ্লাইট ৯৩-এর বীরত্ব
নাইন-ইলেভেনের হামলা আমেরিকার নিরাপত্তাব্যবস্থার বিশাল দুর্বলতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তৎকালীন বিমানবন্দরে অস্ত্র শনাক্ত করার ব্যবস্থা ছিল সীমিত। হামলাকারীরা বক্স-কাটারের মতো ছোট ধারালো অস্ত্র নিয়েই বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্যের সমন্বয়ের অভাবও এই হামলা রুখতে ব্যর্থ হওয়ার একটি বড় কারণ ছিল।
তবে এই অন্ধকারের মাঝেও প্রতিরোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন ইউনাইটেড ফ্লাইট ৯৩-এর যাত্রীরা। তাঁরা যখন বুঝতে পারেন যে বিমানটি ছিনতাই হয়েছে এবং এটি দিয়ে আরেকটি হামলা চালানো হবে, তখন তাঁরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সন্ত্রাসীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁদের এই বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের কারণেই বিমানটি তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি, যা আরও বড় বিপর্যয় থেকে দেশকে রক্ষা করেছিল।
ধ্বংসযজ্ঞ ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব
নাইন-ইলেভেনের হামলায় ১৯ জন হামলাকারীসহ মোট ২,৯৯৬ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান, যাদের মধ্যে ৭৮টি দেশের নাগরিক ছিলেন। শুধু ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারেই নিহত হন ২,৭৬৩ জন। আটকে পড়া মানুষদের বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ দেন নিউইয়র্কের ৩৪৩ জন দমকলকর্মী ও ৬০ জন পুলিশ সদস্য।
তবে এই হামলার প্রভাব শুধু নিহতের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। টাওয়ার ধসে পড়ার পর ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত ধুলার কারণে হাজার হাজার উদ্ধারকর্মী এবং স্থানীয় বাসিন্দা ক্যানসার ও শ্বাসতন্ত্রের মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হন। নিউইয়র্ক সিটি স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, প্রায় ১০ হাজার ফার্স্ট রেসপন্ডার ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন, যা আজও সেই ভয়াবহতার সাক্ষ্য বহন করে।
গ্রাউন্ড জিরো: শোক থেকে শক্তিতে রূপান্তর
যেখানে একসময় টুইন টাওয়ার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল, সেই ‘গ্রাউন্ড জিরো’ আজ শোক, স্মৃতি ও শ্রদ্ধার প্রতীক। সেখানে নির্মিত হয়েছে নাইন-ইলেভেন মেমোরিয়াল অ্যান্ড মিউজিয়াম। ধ্বংস হয়ে যাওয়া টাওয়ার দুটির অবয়বে তৈরি করা হয়েছে দুটি বিশাল জলাধার, যার চারপাশে খোদাই করা আছে নিহত প্রত্যেক ব্যক্তির নাম। প্রতি বছর ১১ সেপ্টেম্বর এখানে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হন সেই ভয়াল দিনে হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের স্মরণ করতে।
নাইন-ইলেভেন শুধু একটি সন্ত্রাসী হামলা ছিল না; এটি ছিল একবিংশ শতাব্দীর গতিপথ নির্ধারণকারী একটি ঘটনা, যা বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তা, রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে চিরতরে বদলে দিয়েছে।
Source: Prothomalo
