শনিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৫ তারিখে রাজধানীর মগবাজারে আল-ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত এক ‘দায়ী ও ওয়ায়েজ সম্মেলনে’ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন। তিনি দেশের আলেম সমাজকে শুধুমাত্র মসজিদের ইমামতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে বরং জাতির বৃহত্তর নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান। তার এই বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ধর্মীয় সম্প্রীতি ও ঐক্যবদ্ধ জাতি
ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে বাংলাদেশের ধর্মীয় সম্প্রীতির উজ্জ্বল ইতিহাসের কথা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী দেশে ৯০.৮ শতাংশ মুসলমান থাকা সত্ত্বেও, জামায়াতে ইসলামী ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে জাতিকে বিভক্ত করার ঘোর বিরোধী। “আমরা এখানে ধর্মের নামে জাতিকে বিভাজিত করার পক্ষে নই। আমরা একটা ঐক্যবদ্ধ জাতি দেখতে চাই,” বলেন তিনি।
তার মতে, হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সকল সম্প্রদায়ের মানুষ যুগ যুগ ধরে এই ভূখণ্ডে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করে আসছে, যা বিশ্বে একটি বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তিনি বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহ প্রদত্ত विवेक (বিবেক) ব্যবহার করে মানুষ তার ধর্মীয় পথ বেছে নেবে এবং এই বৈচিত্র্যই দেশের শক্তি।
সংকটে আলেম সমাজের ভূমিকা
জামায়াত আমির বলেন, একটি জাতি যখন সংকটে পড়ে, তখন আলেম ও শিক্ষিত সমাজকেই পথপ্রদর্শক বা ‘রাহবার’ হিসেবে আবির্ভূত হতে হয়। স্বাধীনতার এত বছর পরেও দেশে একটি মানবিক, দায়িত্বশীল ও সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠিত না হওয়াকে তিনি একটি বড় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেন।
তার মতে, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আলেম সমাজের নির্দেশনা অপরিহার্য। তিনি বলেন, “কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে ওলামায়ে কেরাম পথ দেখালে জাতি উপকৃত হবে। জাতিও তাদের কাছ থেকে সেটাই প্রত্যাশা করে।”
‘শিক্ষিত’ সমাজের সমালোচনা এবং আলেমদের অপরিহার্যতা
ডা. রহমান তার বক্তব্যে এক চাঞ্চল্যকর (মন্তব্য) করেন। তিনি বলেন, “শিক্ষিত সমাজের সবাই নয়, কিন্তু শিক্ষিত সমাজের একটি অংশ যে ক্ষতি জাতির করে, সাধারণ দেশবাসীর কোটি কোটি মানুষ মিলেও সেই ক্ষতি জাতির করতে পারে না।” তার মতে, কলমের এক খোঁচায় যেভাবে একটি জাতির ভাগ্য নির্ধারণ বা ধ্বংস করা যায়, সেই ক্ষমতা সাধারণ মানুষের নেই।
এই প্রেক্ষাপটে, তিনি জাতিকে জাগ্রত ও সতর্ক করার জন্য আলেম সমাজের বিশেষ ভূমিকার কথা বলেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন, “বাংলাদেশের আলেমরা শুধু মসজিদের নেতৃত্ব নয়, জাতিরও নেতৃত্ব দেবে। দেশের আলেমরা সমাজ পরিচালনায় অংশ নিলে দেশ থেকে সব ধরনের দুর্বৃত্তায়ন দূর হবে।”
উপসংহার
জামায়াতে ইসলামীর আমিরের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, তারা দেশের আলেম সমাজকে প্রচলিত ইমামতির ভূমিকার বাইরে এনে এক বৃহত্তর সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের আসনে দেখতে চায়। তাদের মতে, নৈতিক অবক্ষয় এবং দুর্বৃত্তায়নের এই সংকটকালে শুধুমাত্র কুরআন ও সুন্নাহর অনুসারী আলেম নেতৃত্বই পারে দেশকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে। এই আহ্বান বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ এবং সামাজিক পরিবর্তনে আলেমদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবনার উদ্রেক করেছে।
