Falcon Feed

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি ও ছাত্র বিক্ষোভ: উপদেষ্টাদের ৯ ঘণ্টা আটকে থাকার ঘটনাপ্রবাহ

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি ও ছাত্র বিক্ষোভ: উপদেষ্টাদের ৯ ঘণ্টা আটকে থাকার ঘটনাপ্রবাহ

উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে এক মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনার পর পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। শোকাহত ও ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরারসহ প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম প্রায় ৯ ঘণ্টা ধরে অবরুদ্ধ থাকার পর অবশেষে পুলিশি পাহারায় ক্যাম্পাস ত্যাগ করেছেন।

ঘটনার সূত্রপাত

গত সোমবার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনের ওপর বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩১ জন নিহত এবং ১৬৫ জন আহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই মাইলস্টোন স্কুলের কোমলমতি শিক্ষার্থী। দুর্ঘটনার পর উদ্ধার অভিযান চলাকালীন শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, যা শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

বিক্ষোভের দিন

এই প্রেক্ষাপটে, আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টায় শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে একটি শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচির পরিকল্পনা করে। কিন্তু সকাল সোয়া ৯টার দিকে দিয়াবাড়ি আর্মি ক্যাম্প থেকে মাইকিং করে যেকোনো ধরনের সভা-সমাবেশ বা জমায়েত নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এই ঘোষণার পর শিক্ষার্থীরা কলেজের বাইরে বিক্ষোভ শুরু করে।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পরিস্থিতি পরিদর্শনে আসেন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, সি আর আবরার এবং প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তাঁরা যখন ক্যাম্পাস থেকে বের হতে উদ্যত হন, তখনই শত শত শিক্ষার্থী তাঁদের ঘিরে ধরে বিক্ষোভ শুরু করে।

শিক্ষার্থীদের ছয় দফা দাবি

শিক্ষার্থীরা সরকারের কাছে ছয়টি সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করে: ১. দুর্ঘটনায় নিহতদের সঠিক নাম-পরিচয় প্রকাশ করা। ২. আহতদের সম্পূর্ণ ও নির্ভুল তালিকা জনসমক্ষে আনা। ৩. ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান। ৪. বিমানবাহিনীর ব্যবহৃত ঝুঁকিপূর্ণ ও পুরোনো প্রশিক্ষণ বিমান বাতিল করে আধুনিক ও নিরাপদ বিমান চালু করা। ৫. বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ পদ্ধতি ও কেন্দ্র সংস্কার করে আরও মানবিক ও নিরাপদ করা। ৬. শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলার অভিযোগে অভিযুক্ত সেনা সদস্যদের জনসমক্ষে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া।

ব্যর্থ আলোচনা ও দীর্ঘ অপেক্ষা

উপদেষ্টারা কলেজের কনফারেন্স কক্ষে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। আলোচনা শেষে, বেলা পৌনে একটার দিকে উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বেরিয়ে এসে শিক্ষার্থীদের সকল দাবি “অত্যন্ত যৌক্তিক” বলে উল্লেখ করেন এবং সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিটি দাবি পূরণের আশ্বাস দেন।

কিন্তু এই আশ্বাসের পরও শিক্ষার্থীরা তাঁদের বিক্ষোভ অব্যাহত রাখে। উপদেষ্টারা পুনরায় কলেজের ভেতরে ফিরে যেতে বাধ্য হন।

বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে তাঁরা আবার ক্যাম্পাস থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু দিয়াবাড়ি মোড়ে পৌঁছালে শিক্ষার্থীরা তাঁদের গাড়িবহর আটকে দেয় এবং উপদেষ্টাদের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে। পরিস্থিতির মুখে তাঁরা আবার মাইলস্টোন কলেজে ফিরে আসতে বাধ্য হন এবং একাডেমিক ভবন ৭-এ অবস্থান নেন।

পুলিশি পাহারায় প্রস্থান

দিনভর উত্তেজনার পর সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে পুলিশ, র‍্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের তৎপরতা বাড়ে। অবশেষে, সন্ধ্যা ৭টা ৩৪ মিনিটে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর পাহারায় উপদেষ্টাদের গাড়িবহর ক্যাম্পাস ত্যাগ করে। তাঁদের গাড়িবহরটি দিয়াবাড়ির মেট্রোরেল ডিপোর বিকল্প পথ দিয়ে এলাকাটি পার হয়।

এই ঘটনাটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি জাতীয় পর্যায়ে বিমানবাহিনীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সংকট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নটিকে সামনে নিয়ে এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস উইং এক বিবৃতিতে শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো যৌক্তিক বলে স্বীকার করেছে। এখন দেখার বিষয়, সরকার এই দাবিগুলো পূরণে কতটা আন্তরিক এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

Related Articles