রাজনীতিতে আসা-যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু দুধ দিয়ে গোসল করে, সব সম্পর্ক ছিন্ন করে রাজনীতি ছাড়ার ঘটনা নিঃসন্দেহে আলোড়ন সৃষ্টি করার মতোই। এমনই এক ব্যতিক্রমী ঘটনার সাক্ষী হলো নড়াইলের কলোড়া ইউনিয়নের আগদিয়া গ্রাম। মঙ্গলবার বিকেলে গ্রামের মানুষ ও সাংবাদিকদের ডেকে কলোড়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি সাজ্জাদুল ইসলাম দুধ দিয়ে গোসল করে রাজনীতি থেকে চিরতরে বিদায় নিলেন।
কেন এই অভিনব প্রতিবাদ?
সাজ্জাদুল ইসলামের জন্য এই সিদ্ধান্ত কোনো আকস্মিক আবেগ ছিল না, বরং এটি ছিল দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, মানসিক যন্ত্রণা এবং ব্যক্তিগত ক্ষতির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। তাঁর কথা অনুযায়ী, ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত থেকেও তিনি শুধু ক্ষতিগ্রস্তই হয়েছেন।
এক বালতি ও এক গামলাভর্তি দুধ দিয়ে নিজেকে ধুয়ে ফেলার পর সাজ্জাদুল বলেন, “বর্তমান দলের রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতা আমাকে বারবার মানসিক, শারীরিক, সামাজিক ও পারিবারিকভাবে আঘাত করেছে। দলের কারণে আমি বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি।”
তিনি মনে করেন, মানুষের জীবন, আত্মসম্মান এবং পারিবারিক দায়িত্বই সবার আগে। তাই সম্পূর্ণ সজ্ঞানে এবং স্বেচ্ছায় তিনি ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে অব্যাহতি নিচ্ছেন।
ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি এবং হতাশা
সাজ্জাদুলের অভিযোগের তালিকাটি বেশ দীর্ঘ। তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলেও তিনি বা তাঁর পরিবার কোনো সুযোগ-সুবিধা পায়নি। ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি কারও ক্ষতি করেননি, কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলের পর তাঁর বাড়ি ভাঙচুর করা হয় এবং তাঁকে হত্যার চেষ্টাও করা হয়েছিল।
সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায়টি হলো, তাঁকে একটি নাশকতার মামলায় জেল খাটতে হয়, যে ঘটনায় তিনি জড়িত ছিলেন না বলে দাবি করেন। আর সেই জেলে থাকা অবস্থাতেই তাঁর বাবা মারা যান। এই ঘটনাগুলোই তাঁকে রাজনীতি ছাড়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।
পরিবারের সমর্থন এবং এলাকাবাসীর বিস্ময়
সাজ্জাদুলের এই পদত্যাগের ঘোষণায় তাঁর পরিবার তাঁকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। তাঁর ফুফু সোনিয়া বেগম বলেন, “দল করতে গিয়ে আমরা সব দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। গত বছর সাজ্জাদুল জেল খাটার সময় ওর বাবা মারা যায়। এই কারণেই ও রাজনীতি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”
রাস্তার ধারে এই অভিনব দৃশ্য দেখতে ভিড় জমান পথচারীরা। আরাফাত মোল্যা নামের একজন পথচারী বলেন, “রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন দেখি উনি দুধ দিয়ে গোসল করছেন। পরে জানতে পারলাম, এভাবে উনি ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ এবং রাজনীতি ছাড়ছেন।”
সাজ্জাদুল ইসলামের দুধ দিয়ে গোসল করে রাজনীতি ছাড়ার ঘটনাটি কেবল একটি ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ নয়, এটি তৃণমূলের একজন রাজনৈতিক কর্মীর হতাশা এবং ত্যাগের প্রতীকী চিত্রও বটে। যখন একজন কর্মী তাঁর আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করার পরও দল থেকে শুধু বঞ্চনা আর আঘাত পান, তখন তাঁর প্রতিবাদ প্রকাশের ভাষাও হয়তো এমন ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠে। এই ঘটনাটি দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা দেয়—কর্মীদের মূল্যায়ন এবং তাঁদের প্রতি সুবিচার না করা হলে এমন অনেক সাজ্জাদুলের জন্ম হতে পারে, যাঁরা দুধ দিয়ে কেবল নিজেদের শরীর নয়, বরং রাজনীতির সঙ্গে জড়িত সব স্মৃতিকেও ধুয়ে ফেলতে চাইবেন।
সূত্র : প্রথমআলো
