গাজীপুর শহরের সাহাপাড়ার ব্যস্ত সড়কে যা ঘটলো, তা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর হামলা নয়, বরং তা সত্যের সন্ধানে থাকা গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের এক নির্মম ও বর্বর প্রচেষ্টা। দিনের আলোতে, কথিত আছে পুলিশের উপস্থিতিতেই, একজন সাংবাদিককে যখন নির্মমভাবে পেটানো হয়, তখন তা আমাদের সমাজের নিরাপত্তা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
সাহসিকতার সংবাদ সংগ্রহে গিয়েছিলেন আনোয়ার
দৈনিক ‘বাংলাদেশের আলো’ পত্রিকার গাজীপুর স্টাফ রিপোর্টার আনোয়ার হোসেন (৩৫) কোনো ব্যক্তিগত বিবাদে জড়াননি। তিনি গিয়েছিলেন সাধারণ মানুষের পক্ষে কথা বলতে, সমাজের অনিয়ম তুলে ধরতে। সাহাপাড়া এলাকায় কিছু অসাধু চক্র প্রতিদিন প্রতিটি অটোরিকশা থেকে ৩০ থেকে ৪০ টাকা চাঁদা আদায় করছিল – এই খবর সংগ্রহ করতেই তিনি সেখানে যান। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এই চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক উন্মোচন করে জনগণের ভোগান্তি লাঘব করা।
নারকীয় হামলা ও লুটপাট
কিন্তু সত্য প্রকাশে নির্ভীক আনোয়ারের উপস্থিতি টের পেয়ে যায় চাঁদাবাজ চক্র। স্থানীয় চাঁদাবাজ মো. ফরিদ (৩৭) এর নেতৃত্বে ১৫ থেকে ১৬ জনের একটি দল তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাঁকে শুধু মারধর করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, হত্যার উদ্দেশ্যে একটি চায়ের দোকানের পেছনে নিয়ে ইট দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করে রক্তাক্ত করা হয়। তাঁর কাছ থেকে দুটি মুঠোফোন এবং ২৬ হাজার ২৫০ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে, অপরাধীরা কতটা বেপরোয়া এবং সত্যের কণ্ঠকে তারা কতটা ভয় পায়।
পুলিশি তৎপরতা ও বিচার প্রক্রিয়ার শুরু
ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশব্যাপী নিন্দার ঝড় ওঠে। আহত সাংবাদিকের মা বাদী হয়ে গাজীপুর সদর থানায় মামলা দায়ের করেন। আশার কথা এই যে, পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। ঘটনার প্রধান আসামি মো. ফরিদকে বৃহস্পতিবার রাতে সাহাপাড়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে শুক্রবার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
গাজীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মেহেদী হাসান জানিয়েছেন, ঘটনায় জড়িত বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের এই তৎপরতা প্রশংসনীয়, তবে এটিই যথেষ্ট নয়।
শুধু একজন সাংবাদিকের ওপর হামলা নয়
আনোয়ার হোসেনের ওপর এই আক্রমণ একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের সাংবাদিকদের জন্য এক বিপজ্জনক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। যখন একজন সাংবাদিক সত্য উদঘাটন করতে গিয়ে আক্রান্ত হন, তখন আদতে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভকেই আঘাত করা হয়। এটি জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকারের ওপর হামলা।
আমরা আনোয়ার হোসেনের দ্রুত আরোগ্য কামনা করি। একই সাথে, আমরা এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় জড়িত সকল অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। রাষ্ট্র ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে অবশ্যই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তাঁরা কোনো ভয়ভীতি ছাড়াই তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করে যেতে পারেন। আনোয়ারের সাহসিকতা যেন বৃথা না যায়, এবং তাঁর ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত হোক – এটাই সকলের প্রত্যাশা।
Source: Prothomalo
