যে ঘরটিকে একজন নারী সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় মনে করেন, সেই ঘরই যখন হয়ে ওঠে কসাইখানা, তখন সমাজের ভিত কেঁপে উঠতে বাধ্য। ভালোবেসে বাঁধা সংসার, সন্তানদের কলকাকলি—সবকিছু মুহূর্তেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে পারে। এমনই এক দুঃস্বপ্নের শিকার হয়েছেন রাজধানীর শেওড়াপাড়ার সৈয়দা ফাহমিদা তাহসিন (কেয়া)। ১৩ আগস্ট রাতে তার নিথর দেহ পড়ে ছিল হাসপাতালে, আর স্বামী সিফাত আলী তাকে সেখানে ফেলেই পালিয়ে যান। পরিবারের অভিযোগ, এটি আত্মহত্যা নয়, বরং ঠান্ডা মাথার হত্যাকাণ্ড।
কেয়ার চুলার উপর বসানো মাংসের হাঁড়িটি যেন এক নির্মমতার সাক্ষী হয়ে রইল। যে মানুষটি একটু আগেও তার চার সন্তানের জন্য রান্না করছিলেন, তাকেই নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ। এই একটি ঘটনাই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় পারিবারিক সহিংসতার ভয়াবহ রূপ।
পরিসংখ্যান যখন আঁতকে ওঠার মতো
কেয়ার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়। এটি এক ভয়াবহ জাতীয় সংকটের প্রতিচ্ছবি মাত্র। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রকাশিত তথ্য রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো:
- চলতি বছরের প্রথম ৭ মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৩৬৩ জন।
- এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৩২২ জনের।
- সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, হত্যার শিকার নারীদের মধ্যে ১১৩ জনকেই খুন করেছেন তাদের স্বামী।
ভাবুন, মাত্র সাত মাসে ১১৩ জন নারী তার সবচেয়ে আস্থার মানুষটির হাতেই খুন হয়েছেন! এছাড়াও স্বামীর পরিবারের হাতে ৪২ জন এবং নিজ পরিবারের হাতে ৩৩ জন নারী হত্যার শিকার হয়েছেন।
সহিংসতার এই চিত্র আরও স্পষ্ট হয় দুটি জাতীয় হেল্পলাইনের তথ্যে:
- নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হেল্পলাইন ‘১০৯’-এ প্রথম ৭ মাসে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের জন্য কল এসেছে ৪৮,৭৪৫টি।
- জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ সাড়ে ৮ মাসে নারী নির্যাতনের অভিযোগে কল এসেছে ১৭,৩৪১টি, যার মধ্যে ৯,৩৯৪টি অভিযোগই সরাসরি স্বামীর বিরুদ্ধে।
কেবল কেয়া নয়, সর্বত্র একই চিত্র
সংবাদপত্রের পাতা খুললেই এমন আরও অনেক মর্মান্তিক ঘটনার দেখা মেলে:
- সিলেটের গোলাপগঞ্জ: গত ১৮ জুন, সাবিনা বেগম (৩০) নামের এক নারীকে হত্যার পর তার লাশ পুকুরে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে স্বামী আনু মিয়ার বিরুদ্ধে।
- নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ: পারিবারিক কলহের জেরে নিজের স্ত্রী, চার বছর বয়সী সন্তান এবং স্ত্রীর বড় বোন—এই তিনজনকে গলা কেটে ও শ্বাসরোধে হত্যা করে লাশ বস্তাবন্দী করে মাটিচাপা দেন ইয়াছিন আলী নামের এক ব্যক্তি।
এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, পারিবারিক সহিংসতা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে পুরো সমাজে।
কেন এই নির্মমতা? দায় কার?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল আই খান এই সহিংসতার পেছনে মূল কারণ হিসেবে পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং আইন প্রয়োগে দুর্বলতাকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন:
- বিয়ের পর একজন মেয়েকে স্বামীর পরিবারের সব কথা মেনে নিতে হবে—এই মানসিকতা নির্যাতনের ক্ষেত্র তৈরি করে।
- শিক্ষার অভাব এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে নারীরা বেশি নির্যাতনের শিকার হন।
- বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে সামাজিক সংস্কার এবং “সংসার টিকিয়ে রাখার” জন্য পরিবারের চাপ মেয়েদেরকে নির্যাতনমূলক সম্পর্ক থেকে বের হতে বাধা দেয়।
- আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতা এবং অপরাধীর শাস্তির ভয় না থাকাও নির্যাতন বাড়িয়ে তোলে।
বেরিয়ে আসার পথ কী?
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে হলে দ্বিমুখী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অধ্যাপক মনিরুল আই খানের মতে: ১. নারীদের জেগে ওঠা: নারীদের অবশ্যই নির্যাতনমূলক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সাহস সঞ্চয় করতে হবে। মনে রাখতে হবে, একটি ভাঙা সংসার একটি লাশ হয়ে যাওয়ার চেয়ে হাজার গুণে শ্রেয়। ২. রাষ্ট্রের কঠোর ভূমিকা: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে এবং অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যখন একজন নির্যাতনকারী জানবে যে তার অপরাধের কঠিন শাস্তি হবে, তখন সে ভয় পাবে।
কেয়ার অসমাপ্ত রান্না, সাবিনার পুকুরে ভেসে ওঠা লাশ আর নারায়ণগঞ্জের সেই তিনটি বস্তাবন্দী দেহ আমাদের সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই নীরব মহামারী রুখতে ব্যক্তি, পরিবার এবং রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করতে হবে, নতুবা এই মৃত্যুর মিছিল কেবল দীর্ঘই হতে থাকবে।
Source: Prothomalo
