“আমরা সব সময় চুনোপুঁটি ধরি। রুই-কাতলা ধরা পড়ে না। রাঘব বোয়ালদের ধরার চেষ্টা চলছে।” – অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর এই একটি বাক্যই যেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জানান দিচ্ছে। সোমবার সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভা শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা এবং বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে অপরাধ দমনে সরকারের কঠোর অবস্থান, গণপিটুনির মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াই এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে ব্যাপক নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য।
মূল লক্ষ্য: অপরাধী ছাড় পাবে না, নিরীহ কেউ শাস্তি পাবে না
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো কোনো নিরীহ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হয় এবং কোনো প্রকৃত অপরাধী যেন আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে না পারে। বড় অপরাধীদের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এতদিন ধরে শুধুমাত্র ছোটখাটো অপরাধী বা “চুনোপুঁটি” ধরার যে প্রবণতা ছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে এখন “রুই-কাতলা” ও “রাঘববোয়াল” অর্থাৎ সমাজের প্রভাবশালী ও বড় অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। এই বক্তব্য অপরাধ দমনে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
আলোচিত সাম্প্রতিক ঘটনাবলী
সংবাদ সম্মেলনে সাম্প্রতিক কিছু আলোচিত ঘটনা নিয়েও মুখ খোলেন উপদেষ্টা।
- ধানমন্ডির রিকশাচালক গ্রেপ্তার: ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ফুল দিতে আসা এক রিকশাচালককে গ্রেপ্তারের বিষয়ে তিনি জানান, অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানোর জন্যই সেদিন বিশেষ নিরাপত্তা নির্দেশনা ছিল। বিষয়টি নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে ইতোমধ্যে একটি ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
- গণপিটুনি (Mob Justice): দেশে গণপিটুনির মতো ভয়ঙ্কর সামাজিক অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল না হলেও, তা কমিয়ে আনার জন্য সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বলে জানান জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি স্বীকার করেন, ঢাকায় এর প্রবণতা কমলেও রংপুরের মতো কিছু এলাকায় এখনো এ ধরনের ঘটনা ঘটছে, যা নিয়ন্ত্রণে সরকার বদ্ধপরিকর।
- মাই টিভির চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার: বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মাই টিভির চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিনের গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “এ বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞেস না করে আদালতকে জিজ্ঞেস করেন। পুলিশের গ্রেপ্তার করা অবৈধ হলে আদালত ছেড়ে দিত।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বার্তা দেন যে, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলছে এবং বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করছে।
এক বছরেই ২৭ হাজার নতুন নিয়োগ
অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের সাফল্য তুলে ধরে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করতে গত এক বছরে বিভিন্ন সংস্থায় ২৭,৬৩৭ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
- পুলিশ বাহিনী: কনস্টেবল থেকে এসআই পদে ১৫,৮৫১ জন।
- বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি): ৪,৪৬৯ জন।
- আনসার: ৫,৫৫১ জন।
- কারা অধিদপ্তর: ১,৫৫৮ জন।
- ফায়ার সার্ভিস: ২০৮ জন।
এই ব্যাপক নিয়োগ একদিকে যেমন বাহিনীর শূন্যপদ পূরণ করছে, তেমনই নতুন পদ সৃষ্টির মাধ্যমে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট: সরকার শুধুমাত্র ছোটখাটো অপরাধ দমনে সীমাবদ্ধ না থেকে, সমাজের গভীরে প্রোথিত অপরাধের মূল উৎপাটনে মনোযোগী হতে চাইছে। একইসাথে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আধুনিক ও শক্তিশালী করার মাধ্যমে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। এখন দেখার বিষয়, “রাঘববোয়ালদের” ধরার এই চেষ্টা কতটা সফল হয়।
Source: DhakaTribute
