Falcon Feed

কিনলাম রাশিয়ার হেলিকপ্টার, আনতে গেলে ‘আমেরিকা মামা’ রাগ করে! – বাংলাদেশের ২৯৮ কোটি টাকা এখন ‘আকাশে ঝুলন্ত’!

কিনলাম রাশিয়ার হেলিকপ্টার, আনতে গেলে ‘আমেরিকা মামা’ রাগ করে! – বাংলাদেশের ২৯৮ কোটি টাকা এখন ‘আকাশে ঝুলন্ত’!

একটি দেশের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপ অনেক সময় আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল জালে আটকে যেতে পারে। বাংলাদেশ বর্তমানে ঠিক এমনই এক উভয় সংকটের মুখে পড়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাশিয়ার কাছ থেকে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি হেলিকপ্টার কেনার চুক্তি হয়েছিল, কিন্তু মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে সেই হেলিকপ্টার এখন দেশে আনা যাচ্ছে না। একদিকে বিপুল আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা, অন্যদিকে শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক নষ্টের ঝুঁকি—এই উভয় সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ।

কীভাবে এই সংকটের শুরু?

দুর্গম এলাকায় সন্ত্রাস দমন এবং পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলে ২০২১ সালে রাশিয়া থেকে দুটি এমআই-১৭১এ২ মডেলের হেলিকপ্টার কেনার সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ওই বছরের নভেম্বরে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘জেএসসি রাশিয়ান হেলিকপ্টার্স’-এর সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, হেলিকপ্টার দুটির মোট মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৪০০ কোটি টাকা, যার মধ্যে ২৯৮ কোটি টাকা পরিশোধও করে দেওয়া হয়।

কিন্তু মূল সমস্যা হলো, এই চুক্তির কয়েক মাস আগেই, অর্থাৎ ২০২১ সালের এপ্রিলে, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার এই প্রতিষ্ঠানটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। প্রশ্ন উঠেছে, নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে জানার পরেও কেন এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ চুক্তি করা হলো এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করা হলো?

বর্তমান সরকারের উভয় সংকট

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের করা এই চুক্তি এখন নতুন সরকারের জন্য একটি বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে:

১. চুক্তি বাতিল করলে আর্থিক ক্ষতি:

রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি বাতিল করলে ইতিমধ্যে পরিশোধ করা ২৯৮ কোটি টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই। উল্টো, চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আরবিট্রেশন সেন্টারে মামলা করতে পারে এবং পুরো অর্থ দাবি করতে পারে। হেলিকপ্টার দুটি বর্তমানে রাশিয়ার একটি গুদামে পড়ে আছে এবং সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ খরচও বাড়ছে।

২. চুক্তি রক্ষা করলে কূটনৈতিক সংকট:

অন্যদিকে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে হেলিকপ্টার দুটি দেশে আনা হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্য সহযোগী, এবং এই সম্পর্ককে ঝুঁকির মুখে ফেলা দেশের অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক হবে না।

সমাধানের খোঁজে সরকার

এই জটিল পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে বর্তমান সরকার কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছে। গত ৩১ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে একটি উপায় বের করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে যে:

  • হেলিকপ্টার দুটি সম্পূর্ণ বেসামরিক প্রকৃতির।
  • এগুলো মূলত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জননিরাপত্তার কাজে ব্যবহৃত হবে।
  • হেলিকপ্টারগুলো বিশেষভাবে বাংলাদেশের জন্য তৈরি করা হয়েছে, তাই অন্য কোনো দেশের কাছে এগুলো বিক্রি করার সুযোগও কম।

বিশেষজ্ঞদের মতামত কী?

বিশেষজ্ঞরা এই বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে এগোনোর পরামর্শ দিচ্ছেন। ব্যাংকার ও মুদ্রাবাজার বিশেষজ্ঞ মামুন রশীদ-এর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর বাণিজ্য সম্পর্ক বিবেচনায় রেখে নিষেধাজ্ঞাভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য আনা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁর পরামর্শ, ‘বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা ফোরাম চুক্তি (টিকফা)’-এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের সম্মতি নিয়েই কেবল হেলিকপ্টার আনা উচিত।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির একটি সম্ভাব্য সমাধানের পথ দেখিয়েছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশেষ ছাড় বা ‘ওয়েভার’ চেয়ে আবেদন করতে পারে। আবেদনে উল্লেখ করা যেতে পারে যে হেলিকপ্টার দুটি বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত হবে এবং চুক্তি বাতিল করলে বাংলাদেশকে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। তাঁর মতে, বাস্তবতা অনুধাবন করে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো বাংলাদেশকে ছাড় দিতেও পারে।

শুধু হেলিকপ্টার নয়, আরও সংকট

এটিই রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের একমাত্র চুক্তি নয় যা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে সমস্যায় পড়েছে। দেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প—রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র—রাশিয়ার ঋণ ও কারিগরি সহায়তায় নির্মিত হচ্ছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এই প্রকল্পের অর্থ লেনদেন এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধেও জটিলতা তৈরি হয়েছে।

পূর্ববর্তী সরকারের একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বর্তমান বাংলাদেশকে একটি কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। একদিকে দেশের জনগণের অর্থের সুরক্ষা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক প্রজ্ঞা এবং বিচক্ষণতার সঙ্গেই সামনে এগোতে হবে। এই সংকট থেকে উত্তরণ প্রমাণ করবে নতুন সরকার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং জাতীয় স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় কতটা দক্ষ। পুরো বিষয়টি এখন নির্ভর করছে সফল কূটনৈতিক আলোচনার ওপর।

Source: Prothomalo

Related Articles