দিনাজপুর, ২৯ আগস্ট, ২০২৫: শুক্রবারের দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়ার সাথে সাথে দিনাজপুরের বিরল উপজেলার কাঞ্চন মোড় এলাকার ‘জীবন মহল ফ্যামিলি পার্ক অ্যান্ড কমিউনিটি সেন্টার’ যেন এক ভুতুড়ে নগরীতে পরিণত হয়েছে। পার্কের প্রধান ফটক বন্ধ, নেই কোনো নিরাপত্তা প্রহরী। ফটকের সামনে পড়ে থাকা ভাঙা জিনিসপত্রই বলে দিচ্ছিল আগের দিনের ভয়াবহতার কথা। গতকাল, বৃহস্পতিবার বিকেলে ‘অসামাজিক ও ইসলামবিরোধী’ কার্যকলাপের অভিযোগ তুলে এই পার্কে চালানো হয় ব্যাপক হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ। এ ঘটনায় শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত কোনো মামলা না হলেও বাতাসে ভাসছে আতঙ্ক আর ষড়যন্ত্রের গন্ধ।
পার্কের মধ্যবয়সী এক কর্মচারীর চোখেমুখে ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে যখন ভাঙচুর হওয়া স্থাপনাগুলো দেখাচ্ছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল যেন এক ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়া। যে ‘জীবন মহল’ একদিন ছিল মানুষের কোলাহলে মুখর, আজ সেখানে কেবলই সুনসান নীরবতা আর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাপা দীর্ঘশ্বাস।
কী ঘটেছিল সেদিন?
প্রত্যক্ষদর্শী ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিকেলে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে শত শত মানুষ পার্কের সামনে জড়ো হন। তাদের অভিযোগ ছিল, পার্কটির অভ্যন্তরে ‘অসামাজিক’ এবং ‘ইসলামবিরোধী’ কার্যকলাপ চলে আসছে। বিক্ষোভ এক পর্যায়ে সহিংসতায় রূপ নেয়। হামলাকারীরা পার্কের ভেতরে প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় মেডিটেশন সেন্টারসহ বিভিন্ন স্থাপনায়। রিসোর্টের ১৫টি কক্ষের ১১টিরই দরজা-জানালা, আসবাবপত্র ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ভেঙে ফেলা হয়েছে। লুট করা হয়েছে টেলিভিশনসহ মূল্যবান সামগ্রী। হামলায় অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন, যার মধ্যে সাংবাদিকও রয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে ঘটনাস্থলে যেতে হয়।
পেছনের কথা: অভিযোগ ও অভিযান
এই হামলার নেপথ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই উত্তেজনা চলছিল। গত ১৭ই আগস্ট, জেলা প্রশাসনের একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত ‘জীবন মহলে’ অভিযান চালায়। সে সময় ‘অনৈতিক কার্যকলাপের’ অভিযোগে রিসোর্ট থেকে মালিকপক্ষসহ ৭ জনকে আটক করে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এই ঘটনাটিই মূলত সাম্প্রতিক উত্তেজনার আগুনে ঘি ঢালে। এরপর থেকেই পার্কটির বিরুদ্ধে প্রচারণা আরও জোরদার হয়।
মালিকের বক্তব্য: ষড়যন্ত্রের শিকার?
পার্কটির মালিক আনোয়ার চৌধুরী, যিনি জীবন চৌধুরী নামেই বেশি পরিচিত, বিগত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনাজপুর-২ (বিরল-বোচাগঞ্জ) আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তার দাবি, একটি মহল পরিকল্পিতভাবে তার বিরুদ্ধে ভুল বুঝিয়ে लोकांना খেপিয়ে তুলেছে। মুঠোফোনে তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, ‘জীবন মহল’ কোনো দরগা নয়। তিনি ‘লাইফ শাইনিং মেথড’ নিয়ে কাজ করেন, যা অনেকটা কোয়ান্টাম মেথডের মতো মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য একটি পদ্ধতি। তার মতে, আগামী নির্বাচনে তিনি যাতে অংশ নিতে না পারেন, সেজন্যই এই প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়েছে এবং হামলা চালানো হয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রশাসন সঠিক সময়ে পদক্ষেপ নিলে ক্ষয়ক্ষতি এতটা ভয়াবহ হতো না।
জীবন চৌধুরীর ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, তিনি দীর্ঘ ২২ বছর ধরে মানুষের মনস্তত্ত্ব, জ্যোতিষশাস্ত্র এবং মেডিটেশন নিয়ে গবেষণা করে ‘লাইফ শাইনিং মেথড’ তৈরি করেছেন, যা মানুষকে ইতিবাচক জীবনযাপনে সহায়তা করে। ২০০৪ সাল থেকে তিনি তার পৈতৃক জমিতে ধীরে ধীরে এই কমপ্লেক্সটি গড়ে তোলেন, যেখানে বর্তমানে দেড় শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত।
আতঙ্কে কর্মচারী, থমথমে পরিবেশ
পার্কের ব্যবস্থাপক রবিউল ইসলাম জানান, প্রতি বৃহস্পতিবার এখানে মেডিটেশন সেশন হতো এবং পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়া হতো। তিনি বলেন, “আমরা বুঝতে পারিনি এমন হামলা হবে। ভেবেছিলাম তারা সমাবেশ করে চলে যাবেন। কিন্তু তারা যেভাবে ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে, তাতে কিছুই বাকি রাখেনি। অনেকে হেলমেট পরেও এসেছিল।”
আজ পার্কের ভেতরে ঘুরে দেখা যায় এক ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র। মসজিদের পাশে মেডিটেশন সেন্টারে পোড়া আসবাবপত্র, জীবন চৌধুরীর গোলাকার বাসভবনের চারপাশে ভাঙা আসবাবের স্তূপ, কমিউনিটি সেন্টারে ছড়ানো-ছিটানো চেয়ার-টেবিল—সবকিছুই হামলার ভয়াবহতার সাক্ষী হয়ে আছে। ‘জীবন উন্নয়ন সংস্থা’র কার্যালয়েও হামলা চালিয়ে কাগজপত্র নষ্ট ও অর্থ লুট করা হয়েছে বলে কর্মচারীরা অভিযোগ করেন।
অমীমাংসিত প্রশ্ন
দিনাজপুরের ‘জীবন মহলে’র এই ঘটনাটি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। একটি বিনোদন কেন্দ্র ও মেডিটেশন সেন্টারের কার্যক্রম কি আসলেই সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতির পরিপন্থী ছিল? নাকি এটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের একটি অংশ? আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে এমন ধ্বংসযজ্ঞ চালানো কতটা যৌক্তিক? এবং প্রশাসনের ভূমিকা এক্ষেত্রে কতটা পর্যাপ্ত ছিল?
এইসব প্রশ্নের উত্তর সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত ‘জীবন মহলে’ বিরাজ করছে এক ভীতিকর নীরবতা, যার আড়ালে লুকিয়ে আছে বহু মানুষের আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর একটি সুন্দর স্বপ্নের অপমৃত্যুর করুণ কাহিনী। মালিকপক্ষ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও, এই ঘটনার ক্ষত সহজে শুকানোর নয়।
Source: Prothomalo
