Falcon Feed

বাংলাদেশে যত উন্নয়ন হয়েছে সব বিএনপির সময়েই হয়েছে: শামা ওবায়েদ

বাংলাদেশে যত উন্নয়ন হয়েছে সব বিএনপির সময়েই হয়েছে: শামা ওবায়েদ

ঢাকা, বাংলাদেশ – গত শুক্রবার, ৫ই সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ এক জ্বালাময়ী ভাষণে এক দৃঢ় দাবি করেন: “বাংলাদেশে যত উন্নয়ন হয়েছে সব বিএনপির সময়েই হয়েছে।” ফরিদপুরে দলীয় এক সমাবেশে দেওয়া এই ব্যাপক মন্তব্যটি দেশের উন্নয়নের আখ্যান নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যেখানে বিএনপির অর্জনকে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হয়েছে।

মিসেস ওবায়েদের এই মন্তব্যটি ছিল বাংলাদেশে “নতুন রাজনীতির দিগন্ত” উন্মোচনের একটি বৃহত্তর আহ্বানের অংশ, যা গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কারাবাস থেকে মুক্ত হবে। তিনি একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সংসদের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন, যা বিদেশী শক্তির নয়, বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে কাজ করবে।

এই ব্লগ পোস্টে মিসেস ওবায়েদের দাবির সত্যতা অনুসন্ধান করা হবে, যেখানে বিএনপির শাসনামলে গৃহীত উন্নয়নমূলক উদ্যোগগুলো পরীক্ষা করা হবে এবং সেগুলোকে বাংলাদেশের অগ্রগতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে, অন্যান্য প্রশাসনের অবদানসহ, তুলনা করা হবে।

বিএনপির উন্নয়নের রূপরেখা: একটি ফিরে দেখা

শামা ওবায়েদ তার যুক্তির ভিত্তি স্থাপন করেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯-দফা কর্মসূচির উপর। তিনি শ্রোতাদের মনে করিয়ে দেন যে, এই কর্মসূচি একটি স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। এরপর তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ৩১-দফা কর্মসূচির সাথে এর যোগসূত্র স্থাপন করেন, যেখানে নতুন বিএনপি সরকারের প্রথম ১৮ মাসের মধ্যে ১ কোটি যুবকের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতির কথা বলা আছে।

ঐতিহাসিকভাবে, বিএনপির শাসনামল অর্থনৈতিক উদারীকরণের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত। অর্থনীতিকে উন্মুক্ত করা, বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করা এবং বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য প্রায়শই এই দলকে কৃতিত্ব দেওয়া হয়। তাদের শাসনামলের কিছু মূল উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে:

  • অবকাঠামোগত উন্নয়ন: বিএনপি সরকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি এবং বাণিজ্যকে সহজতর করার লক্ষ্যে দেশজুড়ে অসংখ্য রাস্তা, মহাসড়ক এবং সেতু নির্মাণ তদারকি করে।
  • শিক্ষা সংস্কার: বিএনপির নেতৃত্বে বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি কার্যক্রম ছিল উল্লেখযোগ্য সামাজিক উন্নয়নমূলক উদ্যোগ, যা সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি এবং নারীর ক্ষমতায়নে অবদান রাখে।
  • বেসরকারি খাতের প্রসার: দলটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চালনায় বেসরকারি খাতের ভূমিকাকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করে, যা কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কৌশলের একটি ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করছে।

একটি বৃহত্তর প্রেক্ষাপট: আওয়ামী লীগের মেগা-প্রকল্প এবং তথ্যভিত্তিক তুলনা

বাংলাদেশের উন্নয়নের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে হলে, অন্যান্য সরকারের অবদানও বিবেচনা করা অপরিহার্য, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের, যারা দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি বড় অংশ জুড়ে ক্ষমতায় রয়েছে। আওয়ামী লীগ তাদের শাসনামলকে কয়েকটি উচ্চাভিলাষী “মেগা-প্রকল্প”-এর উপর ভিত্তি করে அடையாள দিয়েছে, যা দেশের অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক দৃশ্যপটকে নতুন রূপ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:

  • পদ্মা সেতু: একটি বিশাল প্রকৌশল সাফল্য যা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে রাজধানী ঢাকার সাথে সংযুক্ত করেছে, যা বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করেছে।
  • ঢাকা মেট্রো রেল: রাজধানীর দীর্ঘস্থায়ী যানজট নিরসনের লক্ষ্যে একটি যুগান্তকারী প্রকল্প।
  • রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র: বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যা দেশের ক্রমবর্ধমান শক্তির চাহিদা মেটাতে নির্মিত।
  • বঙ্গবন্ধু টানেল: দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম पाण्या নিচের টানেল, যা বন্দর নগরী চট্টগ্রামে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করেছে।

এই বড় প্রকল্পগুলোর বাইরেও, গত কয়েক দশকের প্রধান আর্থ-সামাজিক সূচকগুলোর দিকে তাকালে উন্নয়নের একটি আরও জটিল চিত্র ফুটে ওঠে। বিশ্বব্যাংক এবং ম্যাক্রোট্রেন্ডসের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ক্ষমতায় থাকা দলের ঊর্ধ্বে উঠে বিভিন্ন ক্ষেত্রে একটি ধারাবাহিক উর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়।

  • জিডিপি প্রবৃদ্ধি: বাংলাদেশ বহু বছর ধরে একটি শক্তিশালী জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বজায় রেখেছে, যা প্রায়শই তার দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশীদের চেয়ে বেশি। প্রবৃদ্ধির হারে ওঠানামা থাকলেও, বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ উভয় সরকারের অধীনেই সামগ্রিক গতিপথ ইতিবাচক ছিল।
  • দারিদ্র্য বিমোচন: দেশটি দারিদ্র্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। গত তিন দশকে দারিদ্র্যের হার ক্রমাগত হ্রাস পেয়েছে, যা ধারাবাহিক সরকার এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রমাণ।
  • স্বাস্থ্য ও শিক্ষা: সাক্ষরতার হার, শিশুমৃত্যুর হার এবং গড় আয়ুর মতো প্রধান সামাজিক সূচকগুলোতে সময়ের সাথে সাথে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে। এই দীর্ঘমেয়াদী প্রবণতাগুলো দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মানব উন্নয়নে একটি টেকসই জাতীয় প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন ঘটায়।
  • সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ (FDI): বিদেশী পুঁজি আকর্ষণের জন্য উভয় প্রধান রাজনৈতিক দল নীতি বাস্তবায়ন করায়, বছরের পর বছর ধরে এফডিআই-এর পরিমাণেও একটি সাধারণ বৃদ্ধি দেখা গেছে।

উপসংহার: অগ্রগতির এক সম্মিলিত উত্তরাধিকার

যদিও শামা ওবায়েদের দাবি যে বাংলাদেশে সকল উন্নয়ন বিএনপির শাসনামলে হয়েছে তা একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা, তথ্য-প্রমাণগুলো একটি আরও জটিল বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। বিএনপি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের উন্নয়নের পথ গঠনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, বিশেষ করে তাদের অর্থনৈতিক উদারীকরণ এবং সামাজিক কর্মসূচির উপর জোর দেওয়ার মাধ্যমে।

তবে, সমস্ত কৃতিত্ব একটি দলকে দেওয়া হলে তা অন্য দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে অস্বীকার করা হবে, যার মধ্যে আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক বৃহৎ অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোও অন্তর্ভুক্ত। প্রধান আর্থ-সামাজিক সূচকগুলোর তথ্য থেকে বোঝা যায় যে, বাংলাদেশের উন্নয়ন একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যেখানে প্রতিটি সরকার তার পূর্বসূরীদের স্থাপিত ভিত্তির উপর নির্ভর করে কাজ করেছে।

পরিশেষে, বাংলাদেশের উন্নয়ন একটি জাতীয় প্রচেষ্টার গল্প; একটি সম্মিলিত প্রয়াস যা লক্ষ লক্ষ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিয়েছে এবং দেশকে একটি আরও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের পথে চালিত করেছে। যদিও রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর এই সাফল্যের একক মালিকানা দাবি করতে পারে, বাস্তবতা হলো এটি অগ্রগতির এক সম্মিলিত উত্তরাধিকার।

Source: Ittefaq

Related Articles