সুস্থ থাকতে হাঁটার কোনো বিকল্প নেই, এ কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু ঠিক কতটা হাঁটতে হবে? বহুল প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, দিনে দশ হাজার পা হাঁটা সুস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, দশ হাজার নয়, বরং তার চেয়ে কম হেঁটেই হৃদরোগ, ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশের মতো মারাত্মক সব রোগের ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।
দশ হাজার কদমের ধারণা: একটি বাণিজ্যিক কৌশল
অনেকেই হয়তো জানেন না যে, প্রতিদিন দশ হাজার পা হাঁটার ধারণাটি কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফল নয়। এর উৎপত্তি ষাটের দশকে জাপানে, একটি পেডোমিটার বা স্টেপ-কাউন্টার বিক্রির বাণিজ্যিক কৌশল হিসেবে। জাপানি ‘মানপো-কেই’ নামক একটি যন্ত্রের নামের অর্থই হলো ‘১০,০০০ স্টেপের মিটার’। সেই থেকেই এই ধারণাটি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা লাভ করে, যার পেছনে শক্ত কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছিল না।
নতুন গবেষণা কী বলছে?
যুক্তরাজ্যের প্রখ্যাত স্বাস্থ্যবিষয়ক জার্নাল ‘দ্য ল্যানসেট পাবলিক হেলথ’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা এই প্রচলিত ধারণাকে বদলে দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও নরওয়ের একদল বিজ্ঞানী প্রায় ১ লক্ষ ৬০ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর কয়েক ডজন গবেষণা পর্যালোচনা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। তাদের মতে, অকালমৃত্যু এবং বিভিন্ন ভয়াবহ রোগের ঝুঁকি কমাতে প্রতিদিন দশ হাজার পা হাঁটার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
দিনে ৭,০০০ পা: ৬টি রোগের বিরুদ্ধে অব্যর্থ দাওয়াই
গবেষণা অনুযায়ী, প্রতিদিন মাত্র ৭,০০০ পা হাঁটলেই ৬টি মারাত্মক রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। যারা দিনে মাত্র ২,০০০ পা হাঁটেন, তাদের তুলনায় যারা ৭,০০০ পা হাঁটেন, তাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি চোখে পড়ার মতো। আসুন দেখে নেওয়া যাক, কোন কোন রোগের ঝুঁকি কতটা কমে:
- ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ: বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার এই ভয়াবহ রোগের ঝুঁকি কমে প্রায় ৩৮ শতাংশ।
- হৃদরোগ (কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ): হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে যায় প্রায় ২৫ শতাংশ।
- ক্যান্সার: ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে প্রায় ২১ শতাংশ।
- টাইপ-২ ডায়াবেটিস: এই রোগের ঝুঁকি কমে প্রায় ২৬ শতাংশ।
- হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়া (Falls): বয়স্কদের জন্য যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, সেই পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা কমে প্রায় ২৮ শতাংশ।
- বিষণ্ণতা (Depression): মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটিয়ে বিষণ্ণতার ঝুঁকিও প্রায় ২২ শতাংশ কমে যায়।
শুধু তাই নয়, এই পরিমাণ হাঁটা অকালমৃত্যুর ঝুঁকিও প্রায় ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
কতটা হাঁটলে সবচেয়ে বেশি উপকার?
গবেষকরা দেখেছেন, ২,০০০ স্টেপের পর থেকে হাঁটার উপকারিতা বাড়তে থাকে এবং প্রায় ৭,০০০ থেকে ৮,০০০ স্টেপ পর্যন্ত এই উপকারিতা সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। এর বেশি হাঁটলে উপকারিতা যে বাড়ে না, তা নয়, তবে বৃদ্ধির হার অনেকটাই কমে আসে। অর্থাৎ, সুস্থ থাকার জন্য ৭,০০০ থেকে ৮,০০০ পা হাঁটাই যথেষ্ট কার্যকর হতে পারে।
অতএব, দশ হাজার স্টেপের কঠিন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পেরে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আপনার প্রতিদিনের হাঁটার রুটিনে মাত্র ৭,০০০ পা হাঁটার লক্ষ্য স্থির করুন। এই সহজ অভ্যাসটিই আপনাকে হৃদরোগ, স্মৃতিভ্রংশ এবং ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ সব রোগ থেকে দূরে রেখে একটি সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন উপহার দিতে পারে। প্রতিটি পদক্ষেপই আপনার সুস্থতার পথে এক একটি বিনিয়োগ।
