Falcon Feed

ওমান প্রবাসীর ঘরে ফেরা: যখন আনন্দযাত্রা পরিণত হলো অনন্তকালের বিদায়ে

ওমান প্রবাসীর ঘরে ফেরা: যখন আনন্দযাত্রা পরিণত হলো অনন্তকালের বিদায়ে

প্রবাস জীবনের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দেশে ফেরার আনন্দ কেমন হয়, তা কেবল একজন প্রবাসীই জানেন। পরিবার-পরিজনের মুখ দেখার জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে থাকে। ওমান প্রবাসী বাহার উদ্দিনও ঠিক এমনই এক আনন্দ আর উত্তেজনা নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন। তাকে বরণ করে নিতে বিমানবন্দরে ছুটে গিয়েছিলেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু কে জানত, এই আনন্দযাত্রা এক নিমিষেই পরিণত হবে এক হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডিতে? একটি দুর্ঘটনা কেড়ে নেবে তার স্ত্রী, সন্তানসহ পরিবারের সাতটি তাজা প্রাণ।

মূল ঘটনা: যে ঘুম কেড়ে নিল সবকিছু

বুধবার, ৬ আগস্ট, ভোরবেলা। ওমান থেকে ফেরা বাহার উদ্দিনকে নিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি ঢাকা থেকে লক্ষ্মীপুরের পথে ছুটছিল। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি আর ভোরের আবেশে হয়তো অনেকের চোখেই ঘুম নেমে এসেছিল। কিন্তু বিপত্তি ঘটল যখন চালকের চোখেও নেমে এল সেই ঘুম।

লক্ষ্মীপুর-চৌমুহনী সড়কের আলাইয়াপুর ইউনিয়নের পূর্ব জগদীশপুর এলাকায় পৌঁছাতেই ঘটে গেল সেই মর্মান্ত расстояic দুর্ঘটনা। প্রবাসীর শ্বশুর ইস্কান্দার মির্জার ভাষ্যমতে, চালক শুরু থেকেই ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। তাকে বারবার অনুরোধ করা হয়েছিল বিশ্রাম নেওয়ার জন্য। কিন্তু সেই অনুরোধ উপেক্ষা করে চালক গাড়ি চালাতে থাকেন। ফলাফল—নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাইক্রোবাসটি রাস্তার পাশের খালে পড়ে যায়।

এক নিমিষে নিঃস্ব প্রবাসী বাহার

এই দুর্ঘটনায় প্রবাসী বাহার উদ্দিন প্রাণে বেঁচে গেলেও হারিয়েছেন তার জীবনের সবকিছু। ঘটনাস্থলেই নিহত হন তার মা মুর্শিদা (৫০), স্ত্রী কবিতা (২৫), একমাত্র শিশুকন্যা মীম (২), ভাইয়ের মেয়ে রেশমী (৯) ও লামিয়া আক্তার (৮), ছোট ভাইয়ের স্ত্রী লাবনী (২৫) এবং নানী ফয়জুন নেসা (৭০)। যে মানুষটি দেশে ফিরেছিলেন প্রিয়জনদের নিয়ে নতুন করে জীবন সাজানোর স্বপ্ন নিয়ে, এক সকালেই তার পৃথিবীটা হয়ে গেল শূন্য।

দুর্ঘটনার পর বাহার, তার শ্বশুর ইস্কান্দার মির্জা এবং চালকসহ আরও দুজন কোনোক্রমে গাড়ি থেকে বের হতে পারলেও বাকিরা ভেতরেই আটকা পড়েন। রাতের অন্ধকারে তাদের চিৎকার শোনার মতো কেউ ছিল না। প্রায় দুই ঘণ্টা পর স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস এসে উদ্ধারকাজ শুরু করে এবং একে একে সাতটি মরদেহ উদ্ধার করে।

শোকের ছায়া

এই মর্মান্তিক খবর লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার উত্তর জয়পুর ইউনিয়নের পশ্চিম চৌপল্লী গ্রামে পৌঁছাতেই সেখানে নেমে আসে শোকের ছায়া। বাহারের বাড়িতে এখন আনন্দের বদলে শুধুই কান্নার রোল। প্রতিবেশীরা ভিড় করছেন, সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষাও যেন হারিয়ে ফেলেছেন সবাই। যে বাড়ি প্রবাসীর আগমনে উৎসবমুখর হওয়ার কথা ছিল, সেই বাড়ি এখন পরিণত হয়েছে এক শোকের মাতমখানায়।

একটি মুহূর্তের অসতর্কতা কীভাবে একটি পরিবারকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারে, এই ঘটনাই তার জ্বলন্ত উদাহরণ। চালকের সামান্য একটু ঘুম কেড়ে নিল সাতটি জীবন, আর একজন প্রবাসীর সারাজীবনের স্বপ্ন। এই শোক শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি পুরো দেশের। আমরা নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। একইসাথে, দূরপাল্লার যাত্রায় চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করার বিষয়টি আরও কঠোরভাবে তদারকির জন্য কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এমন মর্মান্তিক ঘটনার যেন আর পুনরাবৃত্তি না হয়।

সূত্র : Prothomalo

Related Articles