একটি মাস, আরও কিছু শোক সংবাদ, আর কিছু নিভে যাওয়া জীবনের গল্প। বাংলাদেশের সড়ক যেন দিন দিন হয়ে উঠছে এক মৃত্যুফাঁদ। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সর্বশেষ প্রতিবেদন আমাদের সামনে আবারও সেই নির্মম বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে। চলতি বছরের আগস্ট মাসে সারা দেশে ৪৫১টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪২৮ জন, এবং আহত হয়েছেন আরও ৭৯১ জন। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়, এটি শত শত পরিবারের আজীবনের কান্না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দুর্ঘটনার এই মিছিলে সবচেয়ে এগিয়ে আছে মোটরসাইকেল। আগস্ট মাসে মোট নিহতের ৩০ শতাংশেরও বেশি, অর্থাৎ ১৩২ জনই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার। তরুণ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় এই বাহনটিই যেন হয়ে উঠেছে সড়কে মৃত্যুর প্রধান কারণ।
এক নজরে আগস্টের সড়কের চিত্র
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ৯টি জাতীয় দৈনিক, ৭টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়ার তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে। চলুন দেখে নেওয়া যাক আগস্ট মাসের কিছু খণ্ডচিত্র:
- মোট দুর্ঘটনা: ৪৫১টি
- নিহত: ৪২৮ জন (নারী ৬৮, শিশু ৩৪)
- আহত: ৭৯১ জন
- মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা: ১৪৪টি, নিহত ১৩২ জন
- পথচারী নিহত: ৮৩ জন
- চালক ও সহকারী নিহত: ৫২ জন
জুলাই মাসের তুলনায় আগস্টে নিহতের সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও দুর্ঘটনার সংখ্যা কমেছে। জুলাইয়ে ৪৪৩টি দুর্ঘটনায় ৪১৮ জন নিহত হয়েছিলেন। এই সামান্য পরিবর্তন পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে এতটুকুও কমাতে পারেনি।
কোন পথে ঘটছে বেশি দুর্ঘটনা?
প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দুর্ঘটনাগুলোর সিংহভাগই ঘটছে জাতীয় মহাসড়কে।
- জাতীয় মহাসড়ক: ২১৪টি
- আঞ্চলিক সড়ক: ১৩৫টি
- শহরের সড়ক: ৬০টি
- গ্রামীণ সড়ক: ৪২টি
দুর্ঘটনার ধরন খতিয়ে দেখলে দেখা যায়, নিয়ন্ত্রণ হারিয়েই সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা (২০৭টি) ঘটেছে। এর পরেই রয়েছে মুখোমুখি সংঘর্ষ (৯০টি) এবং পথচারীকে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা (৮৫টি)।
বিভাগীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১১৯টি দুর্ঘটনায় ১১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে কম ১৮টি দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত হয়েছেন। একক জেলা হিসেবে ঢাকা জেলাতেই সবচেয়ে বেশি ৩৬টি দুর্ঘটনায় ৩২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।
কেন থামছে না এই মৃত্যুর মিছিল?
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে কিছু প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে, যা আমাদের সবারই জানা কিন্তু সমাধান অধরা। কারণগুলো হলো:
- ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক।
- চালকদের বেপরোয়া গতি ও মানসিকতা।
- নির্দিষ্ট বেতন ও কর্মঘণ্টা না থাকায় চালকদের শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা।
- মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের অবাধ চলাচল।
- তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো।
- সাধারণ মানুষের মধ্যে ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা।
- দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং বিআরটিএর সক্ষমতার অভাব।
- গণপরিবহন খাতে ব্যাপক চাঁদাবাজি।
মুক্তির পথ কোথায়?
শুধু সমস্যা চিহ্নিত করাই নয়, রোড সেফটি ফাউন্ডেশন এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশও করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
১. দক্ষ চালক তৈরি: চালকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বাড়াতে হবে। ২. নির্দিষ্ট বেতন ও কর্মঘণ্টা: চালকদের জন্য নির্দিষ্ট বেতন ও কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করতে হবে। ৩. আইনের কঠোর প্রয়োগ: পরিবহন মালিক-শ্রমিক, যাত্রী ও পথচারী নির্বিশেষে ট্রাফিক আইনের কঠোর ও বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ৪. সার্ভিস রোড নির্মাণ: মহাসড়কে স্বল্পগতির যান চলাচল বন্ধ করে তাদের জন্য আলাদা সার্ভিস রোড তৈরি করতে হবে। ৫. রোড ডিভাইডার: পর্যায়ক্রমে সব মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ করতে হবে। ৬. চাঁদাবাজি বন্ধ: গণপরিবহন খাতকে চাঁদাবাজিমুক্ত করতে হবে। ৭. সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা: সড়ক পথের ওপর চাপ কমাতে রেল ও নৌপথের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। ৮. আইন বাস্তবায়ন: “সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮” এর পূর্ণাঙ্গ ও বাধাহীন বাস্তবায়ন করতে হবে।
প্রতিটি মৃত্যুই একটি অপূরণীয় ক্ষতি। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং মানুষের জীবন সুরক্ষিত করতে কর্তৃপক্ষ এবং নাগরিক হিসেবে আমাদের সকলকেই সচেতন হতে হবে। সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমেই হয়তো আমরা একটি নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব, যেখানে ঘর থেকে বের হয়ে আবার নিরাপদে ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা থাকবে।
Source: Prothomalo
