একুশে জুলাইয়ের ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় সবচেয়ে বেশি শোকের ছায়া নেমে আসে রাজধানী উত্তরার মাইলস্টোন কলেজ প্রাঙ্গণে। প্রিয় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের হারানোর বেদনায় মুহ্যমান ছিল সবাই। সেই শোক ও শূন্যতা কাটিয়ে ওঠার পথে এক মানবিক ও المدر्শী পদক্ষেপ নিল কলেজ কর্তৃপক্ষ। তিন দফা ছুটির পর, আগামীকাল, রবিবার (৩ আগস্ট) থেকে সীমিত পরিসরে খুলে দেওয়া হচ্ছে মাইলস্টোন কলেজ।
তবে এই খোলা স্বাভাবিক সময়ের মতো নয়। আপাতত কোনো ক্লাস বা প্রাতিষ্ঠানিক পাঠদান কার্যক্রম শুরু হচ্ছে না। কলেজ কর্তৃপক্ষের মূল লক্ষ্য এখন শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বস্তি ফিরিয়ে আনা।
পাঠদান নয়, অগ্রাধিকার মানসিক স্বস্তি
কলেজের জনসংযোগ কর্মকর্তা শাহ বুলবুল যেমনটা বলছিলেন, “বিমান দুর্ঘটনার পর পুরো ক্যাম্পাস এক হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থার উন্নয়ন ছাড়া এই মুহূর্তে আমাদের অন্য কোনো অগ্রাধিকার নেই।”
এই কথাটিই বলে দেয়, মাইলস্টোন কলেজ শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি পরিবার। আর পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মানসিক সুস্থতাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা আগামীকাল থেকে কলেজে আসবে, কিন্তু বই-খাতার চাপে নয়, বরং একে অপরের সাথে কথা বলে, শিক্ষকদের সান্নিধ্যে এসে এবং ক্যাম্পাসের পরিচিত পরিবেশে সময় কাটিয়ে মানসিক শক্তি ফিরে পাওয়ার জন্য।
যেভাবে সারিয়ে তোলা হচ্ছে ক্ষত
শিক্ষার্থীদের এই কঠিন সময় পার করতে সাহায্য করার জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে।
- দোয়া মাহফিল: নিহতদের আত্মার শান্তি কামনায় এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্যের জন্য শনি ও রবিবার কলেজ প্রাঙ্গণে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।
- কাউন্সেলিং: শিক্ষকরা সার্বক্ষণিকভাবে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকছেন। তাদের সাথে কথা বলছেন, তাদের মনের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করছেন এবং প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিং প্রদান করছেন।
- বিশেষ মেডিকেল ক্যাম্প: বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক উভয় ধরনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এই উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য।
একতার শক্তিতে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়
একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই সবকিছু এলোমেলো করে দিতে পারে, কিন্তু মানুষের পারস্পরিক সহানুভূতি ও মানবিকতা সেই ধ্বংসস্তূপ থেকেও নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি জোগায়। শাহ বুলবুলের ভাষায়, “আমরা চাই, ধাপে ধাপে শিক্ষার্থীরা তাদের হারানো ছন্দে ফিরে আসুক। এই কঠিন সময়ে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক সমাজের পারস্পরিক সহানুভূতি ও মানবিকতা।”
২১ জুলাইয়ের দুর্ঘটনার পর থেকে কলেজের প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় একটি কন্ট্রোল রুম চালু ছিল, যা এই দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রতিষ্ঠানটির আন্তরিকতার প্রমাণ দেয়।
মাইলস্টোন কলেজের এই উদ্যোগটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠান খোলার ঘোষণা নয়, এটি শোককে শক্তিতে পরিণত করার এক অনন্য উদাহরণ। এটি প্রমাণ করে যে, শিক্ষার মূল ভিত্তি শুধু জ্ঞানার্জন নয়, বরং মানবিকতা এবং একে অপরের পাশে দাঁড়ানো। আমরা আশা করি, মাইলস্টোন কলেজের শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে তাদের মানসিক শক্তি ফিরে পাবে এবং আবারও প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠবে প্রিয় ক্যাম্পাস। এই কঠিন সময়ে পুরো মাইলস্টোন পরিবারের প্রতি রইল আমাদের গভীর সমবেদনা ও শুভকামনা।
সূত্র : Thedailycampus
