Falcon Feed

ওভালের মহাকাব্য: খলনায়ক থেকে নায়ক হয়ে সিরাজ যেভাবে লিখলেন ভারতের ঐতিহাসিক জয়

ওভালের মহাকাব্য: খলনায়ক থেকে নায়ক হয়ে সিরাজ যেভাবে লিখলেন ভারতের ঐতিহাসিক জয়

টেস্ট ক্রিকেটকে কেন ক্রিকেটের সেরা সংস্করণ বলা হয়? উত্তরটা মিললো ওভালের শেষ দিনে। অবিশ্বাস্য নাটকীয়তা, স্নায়ুক্ষয়ী মুহূর্ত আর একজন বোলারের খলনায়ক থেকে নায়ক হয়ে ওঠার এক জীবন্ত মহাকাব্য দেখলো ক্রিকেট বিশ্ব। আর সেই মহাকাব্যের শেষটা লিখলেন মোহাম্মদ সিরাজ, যার এক ডেলিভারিতেই ইংল্যান্ডের স্বপ্ন ভেঙে ভারতকে এনে দিলেন টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক জয়।

শেষ দিনের স্নায়ুযুদ্ধ

৩৭৪ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ইংল্যান্ডের শেষ দিনে দরকার ছিল মাত্র ৩৫ রান, আর ভারতের প্রয়োজন ছিল ৪ উইকেট। সমীকরণটা যতটা সহজ মনে হচ্ছিল, ওভালের মেঘলা আকাশ আর ইংল্যান্ডের লোয়ার অর্ডারের চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা ঠিক ততটাই কঠিন করে তুলেছিল ভারতের পথ। দিনের শুরুতেই জেমি ওভারটনের আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে মনে হচ্ছিল, ইংল্যান্ড হয়তো সহজেই ম্যাচটা বের করে নেবে।

নায়কের প্রত্যাবর্তন: সিরাজের প্রায়শ্চিত্ত

ক্রিকেট মাঠে এক মুহূর্তের ভুল আপনাকে খলনায়ক বানিয়ে দিতে পারে। আগের দিন হ্যারি ব্রুকের সহজ ক্যাচ ফেলে ছক্কা বানিয়ে দেওয়া মোহাম্মদ সিরাজের চেয়ে ভালো এটা আর কে জানতো? সেই ভুলের বোঝা কাঁধে নিয়েই যেন তিনি মাঠে নেমেছিলেন।

কিন্তু সেরা খেলোয়াড়রা জানেন কীভাবে ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ফিরে আসতে হয়। সিরাজ সেটাই করে দেখালেন। প্রথমে জেমি স্মিথকে ফিরিয়ে দিয়ে ভারতকে ম্যাচে ফেরান। এরপর আম্পায়ার্স কলে ওভারটনকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলে ইংল্যান্ডকে ব্যাকফুটে ঠেলে দেন। প্রতিটি উইকেট শিকারের পর তার গর্জনে মিশে ছিল আগের দিনের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার তাগিদ।

ইংল্যান্ডের অবিশ্বাস্য লড়াই ও অ্যাটকিনসনের বীরত্ব

ইংল্যান্ড হারলেও তাদের লড়াইকে কুর্নিশ জানাতেই হবে। ৩৫৭ রানে নবম উইকেট হারানোর পর যখন সবাই ভারতের জয় সময়ের অপেক্ষা বলে ধরে নিয়েছিল, তখনই শুরু হয় আসল নাটক। ভাঙা হাত সোয়েটারের নিচে লুকিয়ে মাঠে নামেন ক্রিস ওকস! এই দৃশ্যই বলে দিচ্ছিল, ইংল্যান্ড এক ইঞ্চিও জমি ছাড়তে রাজি নয়।

অন্য প্রান্তে তখন এক অবিশ্বাস্য লড়াই লড়ছিলেন গাস অ্যাটকিনসন। ঠাণ্ডা মাথায় ব্যাটিং করে ওকসকে নন-স্ট্রাইকে রেখে একাই ম্যাচ বের করে নেওয়ার পণ করেছিলেন তিনি। আকাশদীপের হাত ফসকে তার একটি শট যখন ছক্কা হয়ে গেল, তখন মনে হচ্ছিল অ্যাটকিনসনই হতে যাচ্ছেন ইংল্যান্ডের জয়ের নায়ক। ভারতের সমর্থকদের হৃদস্পন্দন তখন প্রায় থেমে যাওয়ার জোগাড়।

শেষ অঙ্কের নাটক ও সিরাজের সেই ডেলিভারি

শেষ ওভারে জয়ের জন্য ইংল্যান্ডের প্রয়োজন মাত্র ৭ রান। হাতে ১ উইকেট। স্ট্রাইকে ভয়ংকর হয়ে ওঠা অ্যাটকিনসন। কার হাতে বল তুলে দেবেন অধিনায়ক? উত্তরটা সবারই জানা ছিল—মোহাম্মদ সিরাজ।

নায়ক হওয়ার মঞ্চ প্রস্তুত ছিল। সিরাজ তার শেষ দায়িত্বটুকু পালন করতে এলেন। ওভারের চতুর্থ বল। একটি নিখুঁত ইয়র্কার সরাসরি উড়িয়ে দিল অ্যাটকিনসনের স্টাম্প। গোটা ওভাল যেন ফেটে পড়লো ভারতীয় সমর্থকদের উল্লাসে! ৬ রানের এই অবিশ্বাস্য জয়ে সিরাজ কেবল ৫ উইকেটের কোটাই পূর্ণ করলেন না, পূর্ণ করলেন নিজের প্রায়শ্চিত্তও। রানের হিসেবে এটি টেস্টে ভারতের সবচেয়ে কম ব্যবধানে জয়।

শেষ পর্যন্ত, এই ম্যাচটি কেবল একটি জয়-পরাজয়ের পরিসংখ্যান হয়ে রইল না। এটি হয়ে রইল মোহাম্মদ সিরাজের দৃঢ় মানসিকতার গল্প, ইংল্যান্ডের অদম্য লড়াইয়ের গল্প এবং টেস্ট ক্রিকেটের সেই চিরায়ত সৌন্দর্যের এক নিখুঁত বিজ্ঞাপন। যে সৌন্দর্য বারবার প্রমাণ করে, শেষ বল হওয়ার আগে কিছুই শেষ হয় না।

সূত্র : প্রথমআলো

Related Articles