Falcon Feed

আদালতে নতুন টুইস্ট: আবু সাঈদকে মারলো কে? পুলিশ নাকি ChatGPT?

আদালতে নতুন টুইস্ট: আবু সাঈদকে মারলো কে? পুলিশ নাকি ChatGPT?

জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চলমান মামলার সাক্ষ্যগ্রহণে এক নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। আসামীপক্ষের আইনজীবী দাবি করেছেন, এই মামলার অন্যতম প্রধান আলামত, রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ভিডিও ফুটেজটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। তবে, এই দাবিকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন ভিডিওচিত্র ধারণকারী সাংবাদিক।

বুধবার, ৬ আগস্ট, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ মামলার তৃতীয় দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এদিন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রিনা মুরমু এবং এনটিভির রংপুর প্রতিনিধি একেএম মঈনুল হক তাদের সাক্ষ্য প্রদান করেন। তারা ২০২৩ সালের ১৬ জুলাই আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের পূর্বাপর পরিস্থিতি আদালতের সামনে তুলে ধরেন।

সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আসামীপক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন সাংবাদিক মঈনুল হককে জেরা করার সময় এই চাঞ্চল্যকর দাবিটি করেন। তিনি বলেন, “আবু সাঈদের ওপর হামলার যে ভিডিও ফুটেজ রয়েছে, তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।”

তবে, এই দাবি তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেন সাক্ষী মঈনুল হক। তিনি আদালতকে জানান যে, উক্ত ফুটেজটি তিনি নিজেই ধারণ করেছেন এবং এটি সম্পূর্ণ সত্য ও আসল ঘটনা। তার এই দৃঢ় অবস্থানের ফলে আদালতের কার্যক্রমে এক নাটকীয় মুহূর্তের সৃষ্টি হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীর চোখে আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড

এদিন আদালতে সাক্ষ্য প্রদানকালে রিনা মুরমু, যিনি একজন প্রত্যক্ষদর্শী, তিনি আবেগঘন বর্ণনা দেন। তিনি জানান যে, তিনি নিজের চোখে পুলিশ সদস্যদের আবু সাঈদকে লক্ষ্য করে গুলি চালাতে দেখেছেন। তার ভাষ্যমতে, “আমি ঘটনাস্থলের কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলাম এবং দেখি যে দুইজন পুলিশ তাকে গুলি করে। আমি পরে তাদের নাম আমির (সাবেক সাব-ইন্সপেক্টর) এবং সুজন চন্দ্র (সাবেক কনস্টেবল) বলে জানতে পারি।” রিনা মুরমু এই হত্যাকাণ্ডের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দায়ী করেন এবং ন্যায়বিচার দাবি করেন।

মামলার প্রেক্ষাপট ও অভিযোগ

২০২৩ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বাংলাদেশে কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলন পরবর্তীতে সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। এই আন্দোলন চলাকালে সহিংসতায় বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ড অন্যতম আলোচিত ঘটনা। এই সকল মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করা হয়।

প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে এই সকল ঘটনার ‘কেন্দ্রবিন্দু’ হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে, যেখানে তার নির্দেশেই আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এমন সহিংস পদক্ষেপ নেয় বলে দাবি করা হয়।

এআই প্রযুক্তির অপব্যবহারের শঙ্কা ও বাস্তবতা

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিপফেক বা এআই দ্বারা তৈরিকৃত ভিডিও এবং ছবি এখন এতটাই নিখুঁতভাবে তৈরি করা সম্ভব যে, সাধারণ চোখে তা ধরা প্রায় অসম্ভব। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে যে কোনো ব্যক্তির কণ্ঠস্বর এবং চেহারা নকল করে ভুয়া ভিডিও তৈরি করা যায়, যা বিচারিক প্রক্রিয়ায় এক নতুন এবং গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

তবে, এই ধরনের ভুয়া কন্টেন্ট শনাক্ত করার জন্য বিভিন্ন ফরেনসিক টুলস ও পদ্ধতিও রয়েছে। আইনজীবীরা বলছেন, আদালতে কোনো ভিডিওকে এআই-জেনারেটেড বলে দাবি করা হলে, তা প্রমাণের দায়িত্বও আবেদনকারীর ওপর বর্তায়। এক্ষেত্রে, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের প্রয়োজন হবে।

শেখ হাসিনার আইনজীবীর এই দাবি এই মামলায় একটি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে যেমন রয়েছে প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং স্ব-ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজ, অন্যদিকে রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির সম্ভাব্য অপব্যবহারের অভিযোগ। আগামী ১৭ আগস্ট এই মামলার পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে। সকলের দৃষ্টি এখন আদালতের দিকে, কীভাবে এই প্রযুক্তিগত বিতর্ক এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে বিচারকার্য এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় তা দেখার জন্য। এই মামলার রায় বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।

সূত্র : Ittefaq

Related Articles