ঢাকা, ২৬ আগস্ট, ২০২৫ – দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ হিজাব পরা নিয়ে বিতর্কের মুখোমুখি হয়েছে। এক নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। প্রতিষ্ঠানের বসুন্ধরা ক্যাম্পাসের একজন শিক্ষিকার বিরুদ্ধে ২২ জন ছাত্রীকে হিজাব পরার কারণে ক্লাস থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার জেরে অভিযুক্ত শিক্ষিকাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।
আজ মঙ্গলবার, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগমের সই করা এক নোটিশে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির এই পদক্ষেপ দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত
অভিযোগ অনুযায়ী, গত রবিবার (২৪ আগস্ট) ভিকারুননিসা নূন স্কুলের বসুন্ধরা প্রভাতি শাখার ষষ্ঠ শ্রেণির ইংরেজি ক্লাসে এই ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী ছাত্রীদের অভিভাবকরা জানান, তাদের কন্যারা হিজাব পরে ক্লাসে গেলে অভিযুক্ত শিক্ষিকা ফজিলাতুন নাহার তাদের তিরস্কার করেন এবং ক্লাস থেকে বের করে দেন। কয়েকজন ছাত্রী অভিযোগ করে, তাদের ‘মাদ্রাসার ছাত্রী’ বলে কটূক্তি করা হয় এবং স্কুলের ইউনিফর্মের অংশ নয় এমন হিজাব পরার জন্য ভর্ৎসনা করা হয়।
এই ঘটনায় ছাত্রীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং অভিভাবকদের কাছে বিষয়টি জানায়। এরপরই অভিভাবক মহলে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয় এবং তারা স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন।
স্কুল কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ
অভিভাবকদের অভিযোগের ভিত্তিতে স্কুল কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। একটি অ্যাডহক (অস্থায়ী) কমিটি গঠন করে ঘটনার তদন্ত শুরু করা হয়। তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় অভিযুক্ত শিক্ষিকা ফজিলাতুন নাহারকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগমের জারি করা নোটিশে বলা হয়েছে, “ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বসুন্ধরা প্রভাতি শাখার ষষ্ঠ শ্রেণির একটি শ্রেণিকক্ষ থেকে ২২ জন শিক্ষার্থীকে হিজাব পরার কারণে ক্লাস থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এবং অ্যাডহক কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওই শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।”
একই সাথে, অভিযুক্ত শিক্ষিকাকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে চাকরি থেকে কেন স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হবে না, এই মর্মে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়েছে।
অভিযুক্ত শিক্ষিকার বক্তব্য
এদিকে, অভিযুক্ত শিক্ষিকা ফজিলাতুন নাহার গণমাধ্যমের কাছে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, তিনি ছাত্রীদের হিজাব পরতে নিষেধ করেননি। তার আপত্তি ছিল স্কুলের নির্ধারিত ড্রেস কোড নিয়ে। তিনি বলেন, “আমাদের স্কুলের একটি ড্রেস কোড আছে। এখানে কেউ পর্দা করতে চাইলে সাদা স্কার্ফ পরতে হবে। কিন্তু অনেকেই রঙিন ওড়না পরে এসেছিল। আমি তাদের স্কুলের নিয়ম মেনে চলতে বলেছিলাম।” তার মতে, তিনি কাউকে ক্লাস থেকে স্থায়ীভাবে বের করে দেননি, বরং নিয়ম ভঙ্গের জন্য কিছু সময়ের জন্য ক্লাসের বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন।
অভিভাবক ও নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনায় অভিভাবক এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেক অভিভাবক স্কুল কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, দেশের সংবিধান প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দিয়েছে এবং হিজাব পরা সেই স্বাধীনতারই অংশ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনা ছাত্রীদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অনেকেই শিক্ষিকার এমন আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন, আবার কেউ কেউ স্কুলের ড্রেস কোড কঠোরভাবে অনুসরণ করার পক্ষেও মত দিয়েছেন।
এই ঘটনাটি বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মানুবর্তিতার মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। স্কুল কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং এই ঘটনার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব কী হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
Source: Prothomalo
