বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামী এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির (NCP) মধ্যে একটি默契 বা ঐকমত্যের আভাস দেখা যাচ্ছিলো। বিশেষ করে আগামী নির্বাচন এবং ‘জুলাই সনদ’ খ্যাত সংস্কার প্রস্তাব ইস্যুতে তাদের অবস্থান কাছাকাছি মনে হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই এই দুই দলের মধ্যে তৈরি হয়েছে দূরত্ব, যা রাজনৈতিক মহলে জন্ম দিয়েছে নানা প্রশ্নের।
একসময় জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ আটটি দলের সমন্বয়ে যুগপৎ আন্দোলনের কথা শোনা গেলেও, সম্প্রতি জামায়াত চারটি দলকে নিয়ে আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, যেখানে এনসিপির অনুপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কেন এই আকস্মিক পরিবর্তন? এর পেছনে রয়েছে একাধিক কৌশলগত, আদর্শিক এবং রাজনৈতিক কারণ।
১. সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে মতের অমিল
দূরত্বের অন্যতম প্রধান কারণ হলো সংস্কার প্রস্তাবের সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য। জামায়াতে ইসলামী এবং তার মিত্র দলগুলো সংসদের উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ উভয়টিতেই আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর (Proportional Representation) পদ্ধতির পক্ষে। অন্যদিকে, এনসিপির দাবি শুধু উচ্চকক্ষে পিআর ব্যবস্থা চালু করা হোক।
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবের মতে, যুগপৎ আন্দোলনে না যাওয়ার এটি একটি অন্যতম প্রধান কারণ। দাবির এই মৌলিক পার্থক্যের কারণে совместное আন্দোলনে যাওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
২. নির্বাচনি জোট নিয়ে এনসিপির দ্বিধা ও কৌশল
এনসিপি একটি নতুন দল এবং এর ভেতরে নির্বাচনি জোট নিয়ে দুটি স্পষ্ট ধারা বিদ্যমান। দলের একটি বড় অংশ মনে করে, জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে যদি ক্ষমতায় যাওয়া নিশ্চিত না হয়, শুধু বিরোধী দল হওয়ার জন্য জোট করলে দীর্ঘমেয়াদে দলের রাজনৈতিক ক্ষতি হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিপির একজন সিনিয়র নেতা বলেন, “জামায়াতের সাথে জোট করে এবারই ক্ষমতায় যাওয়া গেলে আমরা সেটা করতাম। কিন্তু যদি বিরোধী দলই হতে হয়, তখন দীর্ঘমেয়াদে আমরা রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবো।”
এই কৌশলগত অবস্থান থেকে দলটি আপাতত কোনো জোটে না গিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
৩. আদর্শিক সংঘাত ও দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন
গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া এনসিপিতে ইসলামপন্থী এবং বামপন্থী—উভয় ঘরানার তরুণরাই যুক্ত হয়েছেন। দলের বামপন্থী অংশটি ধর্মভিত্তিক কোনো দলের সঙ্গে, বিশেষ করে জামায়াতের মতো দলের সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়ে বরাবরই আপত্তি জানিয়ে আসছে। এই অভ্যন্তরীণ আদর্শিক দ্বন্দ্বও জামায়াতের সাথে দূরত্ব তৈরির একটি বড় কারণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাশেদা রওনক খানের মতে, এনসিপি একটি নতুন দল হওয়ায় এর ভেতরে বিভিন্ন মতাদর্শের উপস্থিতি স্বাভাবিক। তাই এখনই কোনো জোটের সঙ্গে মিশে না গিয়ে দলটি একটি স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
৪. ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফল এবং হতাশা
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ডাকসু) ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাকসু) ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফল এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্বে চরম হতাশা তৈরি করেছে। এই নির্বাচনে এনসিপি-সমমনা ছাত্র সংগঠন ‘বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ’ (বাগছাস) শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়, অন্যদিকে জামায়াত-সমর্থিত ‘ইসলামী ছাত্রশিবির’ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।
এই ফলাফলের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস বিশেষভাবে আলোচিত হয়, যেখানে তিনি লেখেন, “বাংলাদেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে আরেকটি ‘ছায়া মওদুদীবাদী’ দল প্রয়োজন নেই।” যদিও তিনি কোনো দলের নাম উল্লেখ করেননি, অনেকেই এটিকে এনসিপির প্রতি একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন। এই ঘটনা দলের জামায়াত-ঘেঁষা অবস্থান থেকে সরে আসার জন্য অভ্যন্তরীণ চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
কৌশলগত দূরত্ব?
এনসিপির নেতারা বলছেন, জামায়াতের সাথে তাদের এখন কোনো সখ্যতা বা দূরত্ব নেই এবং তারা আপাতত নিজস্ব কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যেতে চান। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি একটি সাময়িক কৌশল হতে পারে। ভোটের রাজনীতিতে সমীকরণ দ্রুত বদলায়। আপাতদৃষ্টিতে এই দূরত্বকে কৌশলগত মনে হলেও, নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে এনসিপির অবস্থানে আবারও পরিবর্তন আসতে পারে। আপাতত, দলটি নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি এবং অভ্যন্তরীণ মতানৈক্য নিরসনের দিকেই মনোযোগ দিচ্ছে।
Source: BBC
