একদিকে যখন চিকিৎসকরা মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, ঠিক তখনই অন্যদিকে এক অকল্পনীয় ও মর্মান্তিক ঘটনা নাড়া দিয়ে গেল গোটা দেশকে। খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে ঘটেছে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা, যেখানে মাত্র সামান্য কিছু বকশিশের জন্য একজন রোগীর জীবন কেড়ে নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাটি আমাদের সমাজের নৈতিক অবক্ষয় এবং ব্যবস্থার ফাটলকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
কী ঘটেছিল সেদিন?
খুলনার খানজাহান আলী থানার যোগীপোল এলাকার বাসিন্দা, ৩৮ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম কিডনির সমস্যা নিয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ইউনিটে ভর্তি হন। হাসপাতালে ভর্তির পর তার শ্বাসকষ্ট মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অনেক চেষ্টার পরেও যখন তারা অক্সিজেনের ব্যবস্থা করতে পারছিলেন না, তখন এক পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে রাতের বেলা অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা হয়।
সাইফুলের বড় ভাই আশরাফুল ইসলামের অভিযোগ অনুযায়ী, রবিবার সকালে হাসপাতালের একজন আউটসোর্সিং পরিচ্ছন্নতাকর্মী, জব্বার, তাদের কাছে বকশিশ দাবি করেন। সেই টাকা না দেওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে জব্বার সাইফুলের অক্সিজেন মাস্কটি খুলে নেন এবং অন্য একজন রোগীকে দিয়ে দেন। পরিবারের সদস্যরা এতে বাধা দিতে গেলে, জব্বার তাদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ। এর ঠিক ১৫-২০ মিনিট পরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন সাইফুল ইসলাম।
অভিযোগ ও বাস্তবতা
এই ঘটনার পর অভিযুক্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী জব্বার তার বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন যে, তিনি বকশিশ চাননি এবং অক্সিজেন মাস্কটি খুলে অন্য একজন মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচানোর জন্যই নিয়ে গিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে। হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সুজাত আহমেদ জানিয়েছেন, “একজন রোগীকে কখন অক্সিজেন দিতে হবে বা খুলে নিতে হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার শুধুমাত্র কর্তব্যরত চিকিৎসকেরই রয়েছে। যদি কোনো ক্লিনার চিকিৎসকের অনুমতি ছাড়া অক্সিজেন খুলে নিয়ে থাকেন, তবে তা একটি গুরুতর অপরাধ।” তিনি আরও যোগ করেন যে, এই বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিছু যন্ত্রণাদায়ক প্রশ্ন
এই ঘটনাটি আমাদের সামনে কিছু কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে:
- আমাদের মানবিকতা এবং নৈতিকতা আজ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে?
- হাসপাতালের মতো একটি সংবেদনশীল জায়গায় আউটসোর্সিং কর্মীদের নিয়োগ এবং তাদের কার্যকলাপ কতটুকু নজরদারির মধ্যে থাকে?
- একজন রোগীর জীবনের মূল্য কি সামান্য কিছু টাকার চেয়েও কম?
সাইফুল ইসলামের এই মর্মান্তিক মৃত্যু শুধুমাত্র একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গভীরে থাকা কিছু সমস্যার প্রতিচ্ছবি। আশা করা যায়, কর্তৃপক্ষ এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করবে। শুধুমাত্র সঠিক বিচারই পারে সাইফুলের শোকসন্তপ্ত পরিবারকে কিছুটা সান্ত্বনা দিতে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে।
Source: Bangla Vision
